(কবিতা)
আমি শ্রমিকের গর্জন
- সেখ মঈনুল হক
আমি
শ্রমিক —
রক্তে, ক্ষুধায়, তবু অদম্য অগ্নিপথে !
যা
স্তব্ধতা চিরে বিদ্রোহের গান তোলে !
জ্বলে
ওঠে আমার শিরায় —
চিরন্তন
সংগ্রাম,
অদম্য মানুষের নাম !
(গল্প)
ডালিম রোদে ভেজা সকাল
---আজিজুল হাকিম
১লা মে।
সকালটা আজ অন্য দিনের মতো নয়। শহরের রাস্তায় অদ্ভুত একটা নীরব উত্তেজনা।
হালকা রোদ উঠেছে, কিন্তু সেই রোদ যেন লাল রঙে
রাঙা।
বরকত আজও ভোরে উঠে পড়েছে। প্রতিদিনের মতোই। কিন্তু আজ তার কাজে যাওয়ার তাড়া
নেই—আজ যে মে দিবস।
বরকত একজন নির্মাণ শ্রমিক। শহরের এক প্রান্তে বিশাল অট্টালিকা গড়ে উঠছে,
সেখানে সে কাজ করে। প্রতিদিন ইট, বালি,
সিমেন্টের সঙ্গে লড়াই করে সে নিজের জীবনের স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে
রাখে। কিন্তু আজ সে কাজের পোশাক নয়, পরে নিয়েছে একটি সাদা
পাঞ্জাবি—বুকে ছোট্ট লাল ব্যাজ।
তার
মেয়ে ফাল্গুনী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, — “বাবা, আজ তুমি কাজে যাবে না?”
মায়া
বুঝতে পারে না পুরোটা, কিন্তু বাবার চোখে আজ এক ধরনের আলো দেখে।
সেই আলো সে আগে কখনও দেখেনি।
মিছিল
এগোতে থাকে। লাল পতাকা বাতাসে উড়ে ওঠে।
বরকতের বুকটা হঠাৎ ভরে যায়—এতদিন সে নিজেকে একা ভাবত,
আজ বুঝতে পারে সে একা নয়। তার পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ শ্রমিক বললেন,
— “বাবা, আমরা লড়াই করি যাতে তোমাদের প্রজন্ম
একটু ভালো থাকে।” বরকত মাথা নাড়ে। তার চোখে তখন ফাল্গুনীর মুখ ভেসে ওঠে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে— তার
মেয়েকে সে এমন একটা পৃথিবী দিতে চায়, যেখানে শ্রমিক মানেই
কষ্ট নয়, সম্মান।
মিছিল
শেষে যখন সে বাড়ি ফেরে, তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। কিন্তু
সেই রোদ যেন এখনও লাল।
বরকত একটু থেমে বলে, — “আজ আমরা কথা বলেছি, মা। জেতার শুরুটা এখান থেকেই।”
ফাল্গুনী হাসে। বরকত আকাশের দিকে তাকায়। মতো লাল রোদটা ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে — কিন্তু বরকতের
মনে হচ্ছে, তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে ডালিম রোদে ভেজা সকাল।
—
শেষ —
(প্রবন্ধ)
শ্রমিকের অধিকার ও ভারতের বর্তমান বাস্তবতা
---এষাবেলা
প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে
পালিত হয় বা মে দিবস। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা,
ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং মানবিক
কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে এই দিনের সূচনা। ইতিহাসের ধারায় এটি কেবল একটি স্মরণদিবস
নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক।
অর্থনীতির উজ্জ্বল দিক:
চলতি অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি
প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকার পূর্বাভাস দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক
সংস্থা। উৎপাদন খাতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য 'মেক ইন ইন্ডিয়া',
পরিকাঠামো খাতে 'গতিশক্তি' প্রকল্প, সবুজ শক্তি ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ভারতকে
বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচি
লাখ লাখ মানুষকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। কর্পোরেট ট্যাক্স হ্রাস এবং
উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত প্রণোদনা (Production Linked Incentive) বহু শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা:
তবে পরিসংখ্যানের এই উজ্জ্বল ছবি
যখন মাটিতে নামে, তখন চিত্র পাল্টে যায়। গত কয়েক বছরে
সংঘটিত কোভিড-১৯ অতিমারি লক্ষ লক্ষ অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিককে চরম দারিদ্র্যের
মুখে ফেলে দিয়েছে। এখনো দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিকই অসংগঠিত খাতে কাজ করেন—যেখানে কোনো কাজের নিশ্চয়তা, নির্দিষ্ট বেতন,
সামাজিক নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যসেবা নেই।
মজুরির পরিস্থিতি শোচনীয়।
মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার
ফলে প্রকৃত মজুরির হার কমেছে। বহু ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরি বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতি
তার চেয়ে বেশি, ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের হাতে টাকা
কম পড়ছে। কৃষি নির্ভর মানুষের আয় অস্থিতিশীল, ঠিকাদারি
ব্যবস্থায় নির্মাণশ্রমিকেরা কোনো ন্যূনতম মজুরিও পান না অনেক সময়।
বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার সংকট:
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট
কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, চুক্তিভিত্তিক চাকরি এবং ‘গিগ ইকোনমি’ (যেখানে কোনও স্থায়িত্ব নেই) শ্রমজীবী
মানুষকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক
পরিষেবাগুলি দামি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সহজেই আর্থিক সঙ্কটে
পড়ে যাচ্ছে। একটি বড় অসুখ অনেক পরিবারকে ঋণের বোঝায় চাপা দিচ্ছে। সরকারি
স্বাস্থ্য পরিষেবায় মানুষের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি
স্বাস্থ্যসেবা অধিকাংশের নাগালের বাইরে।
অমসৃণতা ও বঞ্চনা:
অর্থনীতির ফল একেবারে সমানভাবে
বণ্টিত হচ্ছে না। শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। বড় কোম্পানি ও
শেয়ারবাজারের উত্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধনী-দরিদ্রের ব্যবস্থা ক্রমশ বেড়ে
চলেছে। এই অমসৃণ উত্তরণ থেকে শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বঞ্চিত
হচ্ছেন।
শেষ কথা:
ভারতের অর্থনীতির গতিময়তা যদি
সত্যিই দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তাহলে এই বৃদ্ধি
হতে হবে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা,
সংগঠিত ও অসংগঠিত—সব খাতেই সামাজিক সুরক্ষা
জাল বিস্তার করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং
বেকারত্ব কমানোর মতো চ্যালেঞ্জ অবিলম্বে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
সরকারের নীতি যতই বিনিয়োগবান্ধব
হোক না কেন, যদি সেই বিনিয়োগ শ্রমিকের মুখে রুটি, বাচ্চার স্কুল ড্রেস, আর বৃদ্ধের ওষুধের জোগান না
দেয়, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও
মর্যাদা রক্ষা না করে ‘উড়ন্ত ভারত’ গড়া
অসম্ভব। তাই এখন প্রয়োজন সুষম নীতি—যাতে উৎপাদন বাড়ে,
পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মানও সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়।
*******
