অণুগল্প
ছিন্ন ফাগুনের স্মৃতি
— আজিজুল হাকিমসেদিন শেষ ফাগুনের এক হাসিখুশি এক বিকেল বেলা। তখনও বাতাসের গায়ে লেগে আছে সুগন্ধের জৌলুস। রাস্তার পাশের গাছের ডালের আড়াল থেকে কোকিল সুর করে হয়তো তার প্রিয়জনকে ডেকে যাচ্ছে তখনও।
স্কুল ছুটির আধঘণ্টা পরে ইভান বাজারের দিকে যাচ্ছিল বিশেষ একটি কাজে।
জীবননগর গ্রামের মুখে তাকে থামাল এক কিশোরী।
— স্যার, কোথায় যাচ্ছেন?
মেয়েটির মুখে এক অদ্ভুত চেনা হাসি।
ইভান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
সে ক্লাস নাইনে পড়ে। নাম ফারহাত—শান্ত, লাজুক, পড়াশোনায় ভালো। মুখে প্রভাতের লালিমা খেলে বেড়াচ্ছে।
— স্যার, চলুন না, আমাদের বাড়ি?
— তোমাদের বাড়ি কোথায়?
— সামনেই। একটু গিয়েই বামদিকে খেজুরগাছ। তার পাশেই।
ইভানের হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাইফের কথা—স্কুলজীবনের সহপাঠী।
— কাইফের বাড়ির কাছে?
ফারহাত হাসল।
— ও তো আমার কাকা।
হাসির ভেতর মুহূর্তে বদলে গেল মুখ।
চোখেমুখে ভেসে উঠল অন্য এক চেনা কিশোরীর প্রতিচ্ছবি। এ তো ফারহাতের মুখ নয়!
ইভান বিস্ময়মাখা চোখে তাকিয়ে রইল।
সতের বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মুখ তার সামনে উদ্ভাসিত হল। সেই লাবণ্য প্রভায় উজ্জ্বল হাসি। ঝিনুকের মতো সেই চোখ। দেহবল্লরীতে ফাগুনের সেই বাসন্তিক রং।
— তুমি সানার মেয়ে নও?
ফারহাত চমকে উঠল।
— হ্যাঁ। আপনি মাকে চেনেন?
ইভান হালকা হাসল।
— স্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
— তাহলে তো ভালোই হল। ঈদের দিন সন্ধ্যায় আসবেন, স্যার।
— অবশ্যই।
গাড়ি চলতে থাকল।
আর স্মৃতির ভেতরে—মা ও মেয়ের মুখ ভেসে উঠছে, মিলিয়ে যাচ্ছে, একাকার হয়ে যাচ্ছে বারবার।
স্কুলজীবনে ইভানের সমস্ত জগৎ জুড়ে ছিল একটি কিশোরী—সে হল, সানা।
তাকে দেখার নেশায় সে স্কুল কামায় করতে চয়তো না। তার সামনে লজ্জা পাবে বলে পড়া করে যেত।
কিন্তু কথা বলার সাহস তার কোনোদিনও হয়নি।
ওর ভালোবাসাটাই ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। মনের সংগোপনে সে তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চাইত।
ক্লাস নাইনে উঠে সে শুনেছিল—
সানাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যের সংসারে।
সেইখানেই থেমে গিয়েছিল তার ফাগুনের সমস্ত অনুরণন।
ঈদের সন্ধ্যায় যখন পাখিরা খুশির কলরবে বাসায় ফিরছিল, সে ফারহাতদের বাড়ি গেল।
ফারহাতের আপ্যায়নও ছিল ভীষণ আন্তরিক।
আতিথেয়তার পর সানা ঘরে ঢুকল।
সময়ের ছাপ কিছুটা পড়েছে, তবু হাসির ভেতর সেই আলো এখনও সমুজ্জ্বল।
— কেমন আছো?
— ভাল। তুমি?
— আমিও ভাল।
একটু থেমে সানা বলল,
— কিছু মনে করো না। আমি তোমাকে অনেকবার মনে করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু পারছি না। সবাইকে তো আর মনে রাখা যায় না।
ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— সেই ছেলেটাকে কি মনে পড়ে না? যে কবিতা আবৃতিতে প্রথম হত? নাটক করত?
সানা মাথা নাড়ল।
— স্কুলের ঘরগুলোতে তন্নতন্ন করে তোমার মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না।
ইভানের সেই স্মৃতিগুলো মনের আকাশে এক কালো ঝড় তুলল; যা দিশেহারা হয়ে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক বয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে না ফেরার দিগন্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। সে আর কিছুই বলল না।
ফারহাত মায়ের পাশে বসে ছিল।
দুটো মুখ—এখন আলাদা, আবার আশ্চর্যরকম এক।
ফিরে যাওয়ার সময় মা ও মেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।
গাড়িতে উঠার সময় ফারহাত বলল,
— মা আপনাকে ভুলে গেলেও আমি আপনাকে কোনোদিন ভুলবো না, স্যার।
রচনা: ১০/০২/২৬
