i শোষিত ও নিপীড়িতের কবি: কাজী নজরুল ইসলাম

শোষিত ও নিপীড়িতের কবি: কাজী নজরুল ইসলাম

 
শোষিত ও নিপীড়িতের কবি: কাজী নজরুল ইসলাম
 — আজিজুল হাকিম 

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের আকাশে কেবল প্রেম, সৌন্দর্য ও বিরহের কবি নন; তিনি শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্য সৃষ্টিকারী ও স্বৈরাচারী শাসকদলের প্রতি আজও এক  বিদ্রোহের উজ্জ্বল অগ্নিসলাকা বাজ। তিনি কখনো শাসকের পক্ষে, কখনো ধনীর পক্ষে, কখনো উচ্চবর্ণের পক্ষে কথা বলেননি। তাঁর কলম সবসময় নিপীড়িতের পক্ষে, অসহায়ের পক্ষে, শোষিতের পক্ষে, অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে এক প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের আগুন হয়ে জ্বলেছে। তাকে দেখা গেছে মানবতা ও সাম্যবাদেরও এক জলন্ত আর্তি হিসেবে। তাই তাঁকে যথার্থই শোষিত ও নিপীড়িতের কবি বলা যায়। 

নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র কাজী পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি চরম দারিদ্র্য ও শোষণ দেখেছেন। বাবার মৃত্যুর পর মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে, লেটো দলের গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, রুটির দোকানে কাজ করেছেন। এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে শোষিত মানুষের বেদনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও অত্যাচারের নগ্ন চেহারা খুব কাছে থেকে দেখেছেন; যা তার জীবনে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে তিনি বুঝতে পারেন—ব্রিটিশ শাসক যেমন ভারতীয়দের শোষণ করছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও জমিদার, মহাজন ও ধর্মীয় গোঁড়ামি মোল্লারা নিরীহ মানুষের উপরে বর্বর নিপীড়ন চালাচ্ছে।

নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি শোষণের বিরুদ্ধে কেবল কথা বলেননি, তিনি মেহনতী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ শুধু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নয়, সকল প্রকার অন্যায়, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক ঘোষণা:
“আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!”

তাঁর গানগুলোতেও শ্রমিক-কৃষকের কথা বারবার ফিরে এসেছে। “ধান কাটার গান”, “কুলি-মজুরের গান”, “কৃষাণের গান”-এ তিনি শোষিত মানুষের রক্তঝরা ঘামের কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন:
“কে বলে তোরা কুলি মজুর?  
তোরাই তো এ দেশের রাজা!”

নজরুল ইসলাম শ্রেণিবৈষম্য, ধর্মীয় শোষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তিনি “আজাদী” ও “সাম্যবাদী” কবিতায় সাম্যের বাণী বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর মতে, সত্যিকারের স্বাধীনতা ততক্ষণ আসবে না, যতক্ষণ শেষ মানুষটিও শোষণমুক্ত না হবে। 

তাঁর এই বিদ্রোহ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি ছিল সামাজিক বৈষম্য, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে এক জাগ্রত চেতনা। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল অত্যন্ত সাহসী। “ধূমকেতু” পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বহু লেখা ব্রিটিশ সরকারকে আতঙ্কিত করেছিল। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। কিন্তু কারাগারের শৃঙ্খলও তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং তিনি আরও দৃঢ়ভাবে লিখেছেন মানুষের মুক্তির কথা।

তৎকালীন সমাজ যেমন নজরুলকে বুঝতে পারেনি, তেমনি আজও আমরা নজরুলকে সেভাবে অনুধাবণ করতে শিখিনি। নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি, মানবতার কবি। তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত কিংবা শ্রেণিভেদে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর বিখ্যাত কবিতা “সাম্যবাদী”-তে তিনি ঘোষণা করেন—
“গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।”
এই উচ্চারণে ধ্বনিত হয়েছে এক মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না, অত্যাচার করবে না, নির্যাতন চালাবে না। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়— মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়, যা আমরা আজও অবহেলা করে চলছি।

শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের প্রতি নজরুলের সহমর্মিতা ছিল গভীর। “কুলি-মজুর”, “দারিদ্র্য”, “মানুষ” প্রভৃতি কবিতায় তিনি অবহেলিত মানুষের অধিকার ও মর্যাদার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি দারিদ্র্যকে ঘৃণা করেননি; বরং তাকে জীবনের কঠিন শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ভাষায়—
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।”

আজকের সমাজেও যখন বৈষম্য, অন্যায় ও মানবিক সংকট বিদ্যমান, তখন নজরুলের সাহিত্য নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায়, মানবিক হতে শেখায় এবং শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়।

কাজী নজরুল ইসলাম তাই কেবল একটি নাম নয়; তিনি এক অনন্ত মুক্তির চেতনা। তিনি মানুষের মুক্তির কবি, প্রতিবাদের কবি এবং সর্বোপরি শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কবি। তাঁর সাহিত্য আমাদের সমাজবোধ, মানবিকতা ও সাহসের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। এই পৃথিবীর বুকে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তিও নিপীড়ন শোষণ ও বঞ্চনার সম্মুখীন হবেন ততদিন পর্যন্ত নজরুল ইসলাম বেঁচে থাকবেন। সে কথা তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন: 
"মহাবিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত 
যবে উৎপীতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না 
অত্যাচারীর খরগ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না — 
মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত 
আমি সেই দিন হব শান্ত।"

তবুও সব শেষে বলব, নজরুলের এই আগুন আজও জ্বলে উঠুক, জ্বলতে থাকুক প্রত্যেক শোষিত-নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে। জয় হোক বিদ্রোহের, জয় হোক বিশ্বমানবতার।

Post a Comment

Previous Post Next Post