একটি গ্রামের মৃত্যুদিন
- আজিজুল হাকিম
তখন ভোর রাত। বাঁধ ভাঙ্গা গর্জন করতে করতে পানির তোড়
ধেয়ে এল গ্রামের দিকে। রাত দুপুরের পর থেকেই আশেপাশের সকল গ্রামের মসজিদ থেকে
মাইকে ভেসে আসছিল গ্রামবাসীদের জন্য সতর্ক বার্তা। শোনা গেল কালুখালি আর সুবর্ণ
মৃগীর ডাকবাংলার মাঝের বাঁধপুল ভেঙ্গে গেছে।
কিন্তু তারেকের মনের মাঝে উঁকি দিতে শুরু করল নানান প্রশ্ন। এর আগেও সে দেখেছে গোবরা গ্রামে বন্যার ভয়াবহতা। তখন একতলা পাকা বাড়ির উপর দিয়েও পানি গড়াতে দেখেছে। এমন কি বাঁধ পুলের উপর দিয়েও পানি গড়াতে দেখেছে। কিন্তু কখনই বাঁধ ভাঙ্গতে দেখেনি। তাছাড়া সেখানে বন্যা হঠাৎ করে আসে না। ভাগীরথীর পানি যেমন বাড়ে তেমনি সেখানেও পানি বাড়ে। পদ্মার চরের গ্রামগুলির মতো। বাঁধপুলের ওপারের গ্রামগুলির অবস্থাও একই রকম। প্রায় প্রতি বছরই বন্যার পানি আসে। কিন্তু তাদের গ্রামে তো নয়, তারেক ভাবে। জন্মের পর কোনদিন তাদের গ্রাম, এমন কি আশপাশের কোন গ্রামেই বন্যা ঢুকতে দেখেনি। অবশ্য ভৈরব নদী ভেসে বন্যার পানি মাঠে এসেছে, আবার মাঠ থেকেই ফিরে গেছে।
অবশ্য যেখানে তারেকের বাসা সেখানে একদম ভোর বেলায়
বন্যার পানি ঢুকল। কালুখালির বাঁধ ভেঙ্গে প্রথমে সুবর্ণ মৃগী, তারপর কুচগিরিয়া, ছক্কন্নগর হয়ে এল তাদের গ্রামে।
আগে থেকেই বৃষ্টির জলে মাঠঘাট সব ভেসে ছিল। বন্যার জলের সংস্পর্শে কিছুক্ষণের
মধ্যেই পুরো মাঠ সমুদ্রের মতো মাতাল হয়ে উঠল। মাঠের মাঝে গাছ আর বাগান না থাকলে
সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই ভাবা যেত না।
একটু বেলা বাড়তেই তারেক গ্রামের
দিকে গেল। কারণ তার বাবা মায়ের জন্য মন খারাপ করছিল। পাড়ায় প্রবেশ করার মুখ
থেকে সে যা দেখল তা তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। গ্রামের প্রায় সব লোকজন
ইট-মোরামের রাস্তাটির উপরে গিজগিজ করছে। যতদূর
চোখ যাচ্ছে সেই রাস্তার উপরে মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বয়স্ক
ও মধ্যবয়স্ক মানুষগুলো অসহায় চোখে নির্বাক হয়ে আপন আপন বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
কেউ কেউ আপনজনকে বুকে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছে। কিন্তু মাথার উপর তখনও
বৃষ্টির স্বেচ্ছাচারী শাসন। চোখের অশ্রু আর বৃষ্টির ধারা চোখমুখে একাকার হয়ে
গেছে।
ইট মুরামের সেই রাস্তাটি গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে। সেটি বাদ দিয়ে সব রাস্তা জলের তলায় চলে গেছে। রাস্তার উপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি গড়ছে। পাড়ার ওই রাস্তাটি বেশ উঁচু হওয়ার কারণে তখনও ডুবে যায়নি। এদিকে বিভিন্ন বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে মাটির দেয়াল ভেঙ্গে পড়ার ভয়ঙ্কর শব্দ ভেসে আসছে।
সে ভিরের ভেতর দিয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই মেহের নেগারকে দেখতে পেল। সে ওকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল। ও একাকি বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছে। ও তারেককে দেখেই ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তারপর কান্নার সুরেই বলতে শুরু করল, কি করব রে, ভাই? এখন কুঠে যাব? কি খাব? বাড়ি থাক্যা কিছুই বাহির করতে পারিনি রে, ভাই? চোখের সামনে আমার ঘর পানিতে তলিয়্যা গেল।
মেহের নেগার তারেকের সম্পর্কে দাদি। তার বর্তমানে ছেলে মেয়ে কেউ নেই। তার থাকা বলতে মাঠে চার-পাঁচ বিঘা সম্পত্তি। সেই সম্পত্তি খাজনা দিয়ে কোন মতে জীবন অতিবাহিত করে। বয়সও ষাট পার হয়ে গেছে।
তারেক বলল, সবার তো একই অবস্থা, দাদি। এখন সবুর করা ছাড়া কোন পথ নাই। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বলে সে পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে ওর হাতে দিয়ে বলল, এখন এটা রাখুন। পরে আবার দেখা করব। এখন আমাকে আব্বাদের বাড়ি যেতে হবে।
সে ওদের পুরনো বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখল বাড়ির পিছুন দিয়ে নদীর মতো পানি বয়ে চলেছে। তার মা তাকে দেখে কান্না করতে লাগলেন এবং কান্নার সুরে বলতে থাকলেন, “আমাদের কি হবে, বাপ? আমরা কুঠে যাব? কত কষ্ট করে এই ঘরবাড়ি কর্যাছিনু। আর কি কোন দিন বাড়ি তৈরি করতে পারব? আর কি সেই বয়স, সেই হুকবুক আছে? মাঠের ধানগুলোও সব ডুবে গ্যালো। হয়তো এখন কিছুদিন চল্যা যাবে। তারপর কি খাবো?”
তারেক বলল, কান্না করে কোন লাভ নাই। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। বেশি ভেবে কিছুই হবে না। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, দেখি। তাছাড়া কোন সমস্যা হলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।
সে কথাটি শেষ করে বাবার দিকে তাকাল। তিনি কিছুই বললেন না। কেবল এক হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেভাবে একজন তার মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনের দিকে নিস্পলক চেয়ে থাকে।
তারেক ওর মাকে বলল, ঘর থেকে বের করার মতো কি কিছু আছে?
মা বললেন, তেমন কিছুই বাহির করতে পারিনি।
তারেক
বলল,
তাহলে যতটা পারছি আমি বের করছি।
মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, খবরদার। উসরায়
উঠবা না। পিছুনের দেওয়াল
ফাট্যা গেলছে। এক্ষুনি ভাঙয়্যা পড়বে।
মায়ের মুখের কথা মুখেই রইল। এক বিকট শব্দ করে পিছুনের লম্বা দেয়ালটা পানির উপরে আছড়ে পড়ল। দেয়াল ভেঙ্গে পড়ার কারণে সুনামির মতো পানির প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস চারিপাশে উথলে পড়ল। চালের বাঁশগুলো মড়মড় করে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে চুরমার গেল। চালের উপরে হাজার হাজার টালি হুড়মুড় করে পড়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। একটি সুন্দর সাজানা গোছানো বাড়ি মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন বীভৎস কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
অথচ এই বাড়ি নিয়েই তার বাবা মায়ের কত গর্ব, কত অহঙ্কার ছিল। সব নিমেষের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। একদিন এই বাড়িতেই তাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। ওর বাবা তারেককে বলেছিলেন, “ও যেমন নিজে বিয়ে করেছে, তেমনি নিজেই জায়গা কিনে বাড়ি করে সেখানে বাস করুক। আমার এই বাড়িতে তার আশ্রয় হবে না।” আজ থেকে ওর বাবা মায়েরও এই বাড়িতে বাস করা হল না। ওর মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। বাবা মাটির ভাঙ্গা ঘরের দিকে মুখ করে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। কোন কথা নেই, কোন শব্দ নেই। কেবল চোখ ফেটে অশ্রু দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
তারেকের মুখ দিয়েও আর কোন কথা বেরুল না। ওই ভাঙ্গা
ঘরগুলোর দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক চেয়ে রইল।
কত স্মৃতি জড়িরে আছে ওই ঘরগুলোতে। মা কত কষ্ট করে প্রতি সপ্তাহে সুন্দর করে ঘরগুলি লেপতেন। মাঠে থেকে কাঁখে করে মাটি নিয়ে এসে তাতে পানি দিয়ে কাদা করে গমের ভুষি মিসিয়ে সেনে সেনে সারা বাড়ি, পিছুনের দেয়াল সব সুন্দর করে লেপে রাখতেন। গ্রামের অন্যদের দেয়ালের মতো তাদের দেয়ালে কোন ফাটল দেখা যেতো না। যারা বাইরে থেকে আসতেন প্রত্যেকেই তাদের বাড়ির ও ওর মায়ের প্রশংসা করতেন। আর আজ এক নিমেষেই সব পানির তলায় তলিয়ে গেল!
এদিকে
বাবা মায়ের অমতে প্রেম করে ফাল্গুনীকে বিয়ে করার জন্য তারেককে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া
হয়নি। তাই সে একটি বাসা বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে এখন বাস করছে।
তারেক মাকে বলল, কেঁদে কোন লাভ নেই। তাছাড়া আপনার তো একাই এরকম হচ্ছে না, গ্রামের সকলের একই দশা। সকলে যদি সবুর করতে পারে আপনি পারবেন না কেন?
ওর মা কান্নার সুরেই বললেন, তাই তো। তবে এখন কোথায় থাকব তাই ভাবছি।
আমি বললাম, মালপত্র কোথায় তুলেছ?
— মসজিদে।
— তাহলে মসজিদেই থাকুন। তাছাড়া মসজিদের মেঝে তো বেশ উঁচু। আশা করি বানের পানি সেখানে উঠবে না। আর কোন আসুবিধা হলে জানাবেন। আমি আসব।
সে যখন রাস্তায় এসে দাঁড়াল গ্রামের চিত্র সব পাল্টে যাচ্ছে। চোখের সামনেই পাড়ার বাড়িগুলো কাটা গাছের মতো হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। জামসেদের বাড়ি, রহমানের বিশাল দালান বাড়ি - সবই যেন পানির পায়ের তলায় সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে। তারেক পাড়ার ভেতর এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেল। সামনেই জেলে রহমান। বৃষ্টির তলায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। পরনে কেবল মাত্র একটি লুঙ্গি। আর কিচ্ছু নেই। ও ওর বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তারেক কাছে গিয়ে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে কি করছেন, ভাই, সবই ভাগ্যের খেলা। আপনি বরং মোরামের রাস্তায় গিয়ে উঠুন।
তারেকের গলা পেয়ে সে সেদিকে তাকাল, তারপর হাউমাউ করে বাচ্চা ছেলের মতো কান্না করতে লাগল। কপাল এতো পোড়া তা আগে কখনও কল্পনা করিনিরে, ভাই। খায়্যা না খায়্যা এবছরই বাড়ি করনু। আর আজ.... তিনি আরও জোরে কান্না শুরু করে দিলেন। তারেক জেলে রহমানকে সান্ত্বনা দিয়ে সেখান থেকে আবার হাঁটতে লাগল। এদিকে গরু, ছাগল, মুরগি যতটা সম্ভব ইতিমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দু-এক ঘণ্টার মধ্যে একটি পাড়ার সমস্ত বাড়ির দেয়ালগুলি ভেঙ্গে চুরম হয়ে বিকট বিকট শব্দ করে ভেঙ্গে পড়ল। কেঁপে কেঁপে উঠল পায়ের তলার মাটি। চোখের সামনে সমস্ত পাড়াটি গৃহশূন্য হয়ে খাঁখাঁ করে উঠল। কিছু কিছু লোক হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, আবার কেউ কেউ অসহায়ভাবে নির্বাক হয়ে ভাঙ্গনের লীলা খেলা দেখতে লাগল।
তারেক
হাঁটছে। পানি হাঁটু থেকে কোমর, তারপর কোমর থেকে বুক ছুঁইছুঁই
করছে। সে দেখে সারা গ্রামের এমন করুণ অবস্থা আর ভাবে কারও কান্না
দেখার অবস্থা আজ কারও নেই। সে যেন এক বিষণ্ণ কান্নার শহরে হেঁটে যাচ্ছে বরাবর।
প্রায় দুঘণ্টা পর তারেক পাড়া থেকে বেরিয়ে এল। ও গেল হাইস্কুল মোড়ে। সেখানে লোক গিজগিজ করছে। আশেপাশের পাড়া থেকে সকলেই বাড়ি ছেড়ে এসে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে দুতলা স্কুলের নিচু তলার প্রায় অর্ধেক পানির তলায় চলে গেছে। সকলেই উপরের তলায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে এত লোক ধরল কি করে কিছুই বুঝতে পারল না। সকলের চোখেমুখে আতঙ্ক আর নিরাশার ছাপ। সে ওখানে শুনল, ওদের পাড়াগুলি ভোররাতের আগেই বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। অনেকের গরু ছাগল সব ভেসে চলে গেছে। কাউকে কাউকে দেখল মাথায় হাত দিয়ে নিরব হয়ে বসে আছে। কারও কারও চোখে তখনও অশ্রুর চিহ্ন স্পষ্ট।
তারেক বাসায় ফিরে দেখল তখনও পানি বাড়ছে। ফাল্গুনীকে বলল, আমাদেরও আর এখানে থাকা যাবে না। ঘরে পানি ঢুকে যাবে। অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।
এবার তারেকও দিশেহারা হয়ে পড়ল — তাহলে সে বৌবাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে? অবশেষে আবার মোড়ে গেল। সে দেখল, ওর মামাদের দোকানগুলির ছাদে উঠার জন্য বাঁশের সিঁড়ি তৈরি করেছে এবং মামারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। ওর ফুলমামা বললেন, তারেক, তোমরাও এখানেই চলে এস। আমাদের সঙ্গে থাকবে। ততক্ষণে বৃষ্টি কমতে শুরু করেছে। কিন্ত তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। সে ভাবল, মামারা যদি সেখানে থাকতে পারে তাহলে আমি পারব না কেন?
শেষপর্যন্ত ওর বইখাতাগুলো ঘরের উপরের তাকে রেখে দরজায় তালা দিয়ে চালের বস্তা আর কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তখন অবশ্য ঘরের ভিতর পানি ঢুকতে শুরু করেছে। যখন তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তখন সামনের ফাঁকা মাঠে প্রায় বুক পর্যন্ত পানি। সেই বুকভরা পানি ভেঙ্গে তারেক আর ফাল্গুনী হাঁটছে।
সেদিন কোন খাবার ছাড়ায় কিভাবে যেন দিন পার হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারল না। রাতে কিছু মুড়ি খেয়ে ঘুমাতে গেল। কিন্তু তখনও যে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ছেলেকে কোলে নিয়ে সে আর ফাল্গুনী সারা রাত কেবলমাত্র একটি ছাতার তলায় বসে থাকল।
কাল বিকেল বেলা পর্যন্ত বন্যার পানি যা বাড়ার বেড়ে গেছে। আজ আর বাড়ছে না। এদিকে বৃষ্টি পড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। টানা পাঁচ দিন পর মেঘের ঘন আস্তরণকে সরিয়ে সূর্য তার সোনালি হাসি নিয়ে আবির্ভূত হল। অনেক লোকের মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস দেখা গেল।
তারেক সকালে ছাদ থেকে নীচে নেমে এল। সারা মোড়ে লোকে লোকারণ্য। দিপু এসে দাঁড়াল ওর সামনে। বলল, লোকের লজ্জা শরম সব হারিয়ে গেল, ভাই। লোকের সামনেই ছাদের ধারে বসে বসে জোয়ান জোয়ান মেয়েরা প্রকাশ্য পায়খানা করে যাচ্ছে। এমনকি একজন ছাদের উপরে বসে খাচ্ছে তো আর একজন বসে বসে পায়খানা করছে। কেউ কেউ আবার ঘরের ভিতরেই পায়খানা করে বসেছে। এসবই মেয়েদের কাজ। তাছাড়া ওরা যাবেই বা কোথায়? ওরা তো আমাদের মত কলার মাড় ভাসিয়ে কোন বাগানের দিকে বা কোন মাঠের দিকে গিয়ে পানি খরচ করতে পারবে না। অগত্যা যা করার এখানেই করতে হচ্ছে। কি বেশরমের দিন এলো, ভাই। বলতেও লজ্জা করছে। গত রাতে স্কুলের ঘরগুলোতে কে যে কার কাছে শুয়ে ছিল তাও বলা মুসকিল। অনেকে তো বাড়ি থেকে কাপড় চোপড়ও বের করতে পারেনি। বানের ভয়ে খালি হাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।
এমন সময় আকবরও এল। ওর বাড়ি স্কুল মোর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। ওরাও এই স্কুলে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ও বলল, বল ভাই, কেমন আছ?
তারেক বলল, এখন আমরা সকলেই একি রকম, ভাই। তার মধ্যে কিছু হেরফের হয়তো আছে। কেউ কেউ হয়তো একটু ভাল আছে। যেমন আমি। আমি যেখানে আছি সেখানে গ্যাঞ্জামটা কম। যাহোক, তোমাদের দিকের খবর বল, ভাই।
আকবর বলল, কি আর বলব, ভাই? এই মাত্র পাড়া
থেকে আনু। পাড়ায় একটা বাড়িও খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে নাই। সব ধূলিসাৎ হয়্যা গেলছে। মনে
হচ্ছে না, ওটা আমাদের গ্রাম। অনেক বাড়ির চালা পর্যন্ত ভাসিয়ে
নিয়ে চলে গেলছে। সবই মিসমার হয়্যা গেলছে। তার মধ্যে একটা খবর শুন, ভাই। শুনলে তোমারও গা শিহর্যা উঠবে।
তারেক বলল, কি খবর?
— মাস্তারকে তো চিনো। ও কাল সারা দিন সারা রাত ওই পাড়া থাক্যা আসেনি।
— ও কি করছিল?
— ও কলার মাড় তৈরি কর্যা টর্চ লিয়্যা মাঠে মাঠে, আগান-বাগানে
ঘুর্যা ব্যাড়ালছে।
— কিসের জন্য?
— কুন্ঠে কি ভাস্যা যাচ্ছে তাই দেখ্যা বেড়াচ্ছিল। ম্যালায় রাতে নাকি বাগানের ভিতর দিয়্যা একটা জোয়ান মেয়্যার লাশ ভাস্যা যাচ্ছিল। মেয়্যাটা দেখতে নাকি খুব সুন্দর। লাশের কিচ্ছু হয়নি। র র কর্যা জ্বলছিল। বাগানে বাঁশঝাড়ে গিয়্যা লাশটা আটক্যা গেলছিল। কি ভাসছে বুল্যা মাস্তার দেখতে গেল। গিয়্যা তো ও অবাক। দেখল মেয়্যাটার হাতে সোনার চুড়ি, গলায় সোনার মালা, কানে সোনার দুল। মাস্তার ওই মরা মেয়্যাটার গা থাক্যা একটা একটা করে সব খুল্যা লিল। তারপর বাঁশের ঝাড় থাক্যা লাশটা আবার স্রোতের মুখে ঠেল্যা দিল।
তারেক বলল, তাই! সাহস তো কম নয়।
আকবর বলল, সত্যি সাহসের তারিফ করা যায় না। ওদিকে ফজলকেও তো চেনো?
দিপু বলল, উ আবার কি করল?
ও নাকি একটা বাক্স পায়্যাছে। মাঠের মধ্য দিয়্যা বাক্সটাও বানে ভাস্যা যাচ্ছিল। বাক্সটাকেও টান্যা আন্যা খুল্যা মাল্যায় কিছু পায়্যাছে। ওতে নাকি কিছু সোনাদানাও ছিল।
তারেক বলল, সবাই যখন বানের হাত থেকে বাঁচতে চায়ছে তখন ওরা জীবনকে বাজি রেখে এসব কাজ করে বেড়াচ্ছে? সাহস বটে!
হঠাৎ
করে হসপিটালের দিক থেকে কিছু মেয়ের কান্না ও কিছু মানুষের চিৎকার কানে এল। সেই
চিৎকার শুনেই অন্যদের সঙ্গে তারেও দিল ছুট।
সে হসপিটালের কাছাকাছি যেতেই দেখল হসপিটালের মাঠ পানিতে থৈথৈ করছে। সেই গলা পর্যন্ত পানি ভেঙ্গে কয়েকটি লোক একটি লাশ নিয়ে রাস্তার দিকে আসছে।
সবুরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে, গতকাল জমেলা বুড়িকে এই পরিত্যক্ত হসপিটালের একটি ঘরের সানসেডে রেখে তার নাতিরা চলে আসে। আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। আজ খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে বুড়ি মরে পড়ে আছে।
পাশ থেকে একসাদ বলল, হসপিটালের ছাদে রুহুলের স্ত্রীর একটা বাচ্চা হয়েছে।
তারেক কিছুক্ষণ একসাদের দিকে তাকাল, তারপর মাঠের দিকে। সারা মাঠে ঘোলা পানি তইথই করছে। দূরের গাছগুলি গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আর, আরও দূরে ভাঙা, বীভৎস জীবন নিয়ে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামগুলি। কত মানুষের কান্না, কত মানুষের ব্যাথা, কত মানুষের দীর্ঘশ্বাস ভেসে যাচ্ছে এই বন্যার ঘোলা পানিতে।
কিন্তু তারেকের মনের মাঝে উঁকি দিতে শুরু করল নানান প্রশ্ন। এর আগেও সে দেখেছে গোবরা গ্রামে বন্যার ভয়াবহতা। তখন একতলা পাকা বাড়ির উপর দিয়েও পানি গড়াতে দেখেছে। এমন কি বাঁধ পুলের উপর দিয়েও পানি গড়াতে দেখেছে। কিন্তু কখনই বাঁধ ভাঙ্গতে দেখেনি। তাছাড়া সেখানে বন্যা হঠাৎ করে আসে না। ভাগীরথীর পানি যেমন বাড়ে তেমনি সেখানেও পানি বাড়ে। পদ্মার চরের গ্রামগুলির মতো। বাঁধপুলের ওপারের গ্রামগুলির অবস্থাও একই রকম। প্রায় প্রতি বছরই বন্যার পানি আসে। কিন্তু তাদের গ্রামে তো নয়, তারেক ভাবে। জন্মের পর কোনদিন তাদের গ্রাম, এমন কি আশপাশের কোন গ্রামেই বন্যা ঢুকতে দেখেনি। অবশ্য ভৈরব নদী ভেসে বন্যার পানি মাঠে এসেছে, আবার মাঠ থেকেই ফিরে গেছে।
ইট মুরামের সেই রাস্তাটি গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে। সেটি বাদ দিয়ে সব রাস্তা জলের তলায় চলে গেছে। রাস্তার উপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি গড়ছে। পাড়ার ওই রাস্তাটি বেশ উঁচু হওয়ার কারণে তখনও ডুবে যায়নি। এদিকে বিভিন্ন বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে মাটির দেয়াল ভেঙ্গে পড়ার ভয়ঙ্কর শব্দ ভেসে আসছে।
সে ভিরের ভেতর দিয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই মেহের নেগারকে দেখতে পেল। সে ওকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল। ও একাকি বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছে। ও তারেককে দেখেই ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তারপর কান্নার সুরেই বলতে শুরু করল, কি করব রে, ভাই? এখন কুঠে যাব? কি খাব? বাড়ি থাক্যা কিছুই বাহির করতে পারিনি রে, ভাই? চোখের সামনে আমার ঘর পানিতে তলিয়্যা গেল।
মেহের নেগার তারেকের সম্পর্কে দাদি। তার বর্তমানে ছেলে মেয়ে কেউ নেই। তার থাকা বলতে মাঠে চার-পাঁচ বিঘা সম্পত্তি। সেই সম্পত্তি খাজনা দিয়ে কোন মতে জীবন অতিবাহিত করে। বয়সও ষাট পার হয়ে গেছে।
তারেক বলল, সবার তো একই অবস্থা, দাদি। এখন সবুর করা ছাড়া কোন পথ নাই। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বলে সে পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে ওর হাতে দিয়ে বলল, এখন এটা রাখুন। পরে আবার দেখা করব। এখন আমাকে আব্বাদের বাড়ি যেতে হবে।
সে ওদের পুরনো বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দেখল বাড়ির পিছুন দিয়ে নদীর মতো পানি বয়ে চলেছে। তার মা তাকে দেখে কান্না করতে লাগলেন এবং কান্নার সুরে বলতে থাকলেন, “আমাদের কি হবে, বাপ? আমরা কুঠে যাব? কত কষ্ট করে এই ঘরবাড়ি কর্যাছিনু। আর কি কোন দিন বাড়ি তৈরি করতে পারব? আর কি সেই বয়স, সেই হুকবুক আছে? মাঠের ধানগুলোও সব ডুবে গ্যালো। হয়তো এখন কিছুদিন চল্যা যাবে। তারপর কি খাবো?”
তারেক বলল, কান্না করে কোন লাভ নাই। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। বেশি ভেবে কিছুই হবে না। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, দেখি। তাছাড়া কোন সমস্যা হলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।
সে কথাটি শেষ করে বাবার দিকে তাকাল। তিনি কিছুই বললেন না। কেবল এক হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেভাবে একজন তার মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনের দিকে নিস্পলক চেয়ে থাকে।
তারেক ওর মাকে বলল, ঘর থেকে বের করার মতো কি কিছু আছে?
মা বললেন, তেমন কিছুই বাহির করতে পারিনি।
মায়ের মুখের কথা মুখেই রইল। এক বিকট শব্দ করে পিছুনের লম্বা দেয়ালটা পানির উপরে আছড়ে পড়ল। দেয়াল ভেঙ্গে পড়ার কারণে সুনামির মতো পানির প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস চারিপাশে উথলে পড়ল। চালের বাঁশগুলো মড়মড় করে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে চুরমার গেল। চালের উপরে হাজার হাজার টালি হুড়মুড় করে পড়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। একটি সুন্দর সাজানা গোছানো বাড়ি মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন বীভৎস কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
অথচ এই বাড়ি নিয়েই তার বাবা মায়ের কত গর্ব, কত অহঙ্কার ছিল। সব নিমেষের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। একদিন এই বাড়িতেই তাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। ওর বাবা তারেককে বলেছিলেন, “ও যেমন নিজে বিয়ে করেছে, তেমনি নিজেই জায়গা কিনে বাড়ি করে সেখানে বাস করুক। আমার এই বাড়িতে তার আশ্রয় হবে না।” আজ থেকে ওর বাবা মায়েরও এই বাড়িতে বাস করা হল না। ওর মা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। বাবা মাটির ভাঙ্গা ঘরের দিকে মুখ করে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। কোন কথা নেই, কোন শব্দ নেই। কেবল চোখ ফেটে অশ্রু দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
কত স্মৃতি জড়িরে আছে ওই ঘরগুলোতে। মা কত কষ্ট করে প্রতি সপ্তাহে সুন্দর করে ঘরগুলি লেপতেন। মাঠে থেকে কাঁখে করে মাটি নিয়ে এসে তাতে পানি দিয়ে কাদা করে গমের ভুষি মিসিয়ে সেনে সেনে সারা বাড়ি, পিছুনের দেয়াল সব সুন্দর করে লেপে রাখতেন। গ্রামের অন্যদের দেয়ালের মতো তাদের দেয়ালে কোন ফাটল দেখা যেতো না। যারা বাইরে থেকে আসতেন প্রত্যেকেই তাদের বাড়ির ও ওর মায়ের প্রশংসা করতেন। আর আজ এক নিমেষেই সব পানির তলায় তলিয়ে গেল!
তারেক মাকে বলল, কেঁদে কোন লাভ নেই। তাছাড়া আপনার তো একাই এরকম হচ্ছে না, গ্রামের সকলের একই দশা। সকলে যদি সবুর করতে পারে আপনি পারবেন না কেন?
ওর মা কান্নার সুরেই বললেন, তাই তো। তবে এখন কোথায় থাকব তাই ভাবছি।
আমি বললাম, মালপত্র কোথায় তুলেছ?
— মসজিদে।
— তাহলে মসজিদেই থাকুন। তাছাড়া মসজিদের মেঝে তো বেশ উঁচু। আশা করি বানের পানি সেখানে উঠবে না। আর কোন আসুবিধা হলে জানাবেন। আমি আসব।
সে যখন রাস্তায় এসে দাঁড়াল গ্রামের চিত্র সব পাল্টে যাচ্ছে। চোখের সামনেই পাড়ার বাড়িগুলো কাটা গাছের মতো হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। জামসেদের বাড়ি, রহমানের বিশাল দালান বাড়ি - সবই যেন পানির পায়ের তলায় সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে। তারেক পাড়ার ভেতর এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেল। সামনেই জেলে রহমান। বৃষ্টির তলায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। পরনে কেবল মাত্র একটি লুঙ্গি। আর কিচ্ছু নেই। ও ওর বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তারেক কাছে গিয়ে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে কি করছেন, ভাই, সবই ভাগ্যের খেলা। আপনি বরং মোরামের রাস্তায় গিয়ে উঠুন।
তারেকের গলা পেয়ে সে সেদিকে তাকাল, তারপর হাউমাউ করে বাচ্চা ছেলের মতো কান্না করতে লাগল। কপাল এতো পোড়া তা আগে কখনও কল্পনা করিনিরে, ভাই। খায়্যা না খায়্যা এবছরই বাড়ি করনু। আর আজ.... তিনি আরও জোরে কান্না শুরু করে দিলেন। তারেক জেলে রহমানকে সান্ত্বনা দিয়ে সেখান থেকে আবার হাঁটতে লাগল। এদিকে গরু, ছাগল, মুরগি যতটা সম্ভব ইতিমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দু-এক ঘণ্টার মধ্যে একটি পাড়ার সমস্ত বাড়ির দেয়ালগুলি ভেঙ্গে চুরম হয়ে বিকট বিকট শব্দ করে ভেঙ্গে পড়ল। কেঁপে কেঁপে উঠল পায়ের তলার মাটি। চোখের সামনে সমস্ত পাড়াটি গৃহশূন্য হয়ে খাঁখাঁ করে উঠল। কিছু কিছু লোক হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, আবার কেউ কেউ অসহায়ভাবে নির্বাক হয়ে ভাঙ্গনের লীলা খেলা দেখতে লাগল।
প্রায় দুঘণ্টা পর তারেক পাড়া থেকে বেরিয়ে এল। ও গেল হাইস্কুল মোড়ে। সেখানে লোক গিজগিজ করছে। আশেপাশের পাড়া থেকে সকলেই বাড়ি ছেড়ে এসে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে দুতলা স্কুলের নিচু তলার প্রায় অর্ধেক পানির তলায় চলে গেছে। সকলেই উপরের তলায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে এত লোক ধরল কি করে কিছুই বুঝতে পারল না। সকলের চোখেমুখে আতঙ্ক আর নিরাশার ছাপ। সে ওখানে শুনল, ওদের পাড়াগুলি ভোররাতের আগেই বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। অনেকের গরু ছাগল সব ভেসে চলে গেছে। কাউকে কাউকে দেখল মাথায় হাত দিয়ে নিরব হয়ে বসে আছে। কারও কারও চোখে তখনও অশ্রুর চিহ্ন স্পষ্ট।
তারেক বাসায় ফিরে দেখল তখনও পানি বাড়ছে। ফাল্গুনীকে বলল, আমাদেরও আর এখানে থাকা যাবে না। ঘরে পানি ঢুকে যাবে। অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।
এবার তারেকও দিশেহারা হয়ে পড়ল — তাহলে সে বৌবাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে? অবশেষে আবার মোড়ে গেল। সে দেখল, ওর মামাদের দোকানগুলির ছাদে উঠার জন্য বাঁশের সিঁড়ি তৈরি করেছে এবং মামারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। ওর ফুলমামা বললেন, তারেক, তোমরাও এখানেই চলে এস। আমাদের সঙ্গে থাকবে। ততক্ষণে বৃষ্টি কমতে শুরু করেছে। কিন্ত তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। সে ভাবল, মামারা যদি সেখানে থাকতে পারে তাহলে আমি পারব না কেন?
শেষপর্যন্ত ওর বইখাতাগুলো ঘরের উপরের তাকে রেখে দরজায় তালা দিয়ে চালের বস্তা আর কাপড়চোপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তখন অবশ্য ঘরের ভিতর পানি ঢুকতে শুরু করেছে। যখন তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তখন সামনের ফাঁকা মাঠে প্রায় বুক পর্যন্ত পানি। সেই বুকভরা পানি ভেঙ্গে তারেক আর ফাল্গুনী হাঁটছে।
সেদিন কোন খাবার ছাড়ায় কিভাবে যেন দিন পার হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারল না। রাতে কিছু মুড়ি খেয়ে ঘুমাতে গেল। কিন্তু তখনও যে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ছেলেকে কোলে নিয়ে সে আর ফাল্গুনী সারা রাত কেবলমাত্র একটি ছাতার তলায় বসে থাকল।
কাল বিকেল বেলা পর্যন্ত বন্যার পানি যা বাড়ার বেড়ে গেছে। আজ আর বাড়ছে না। এদিকে বৃষ্টি পড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। টানা পাঁচ দিন পর মেঘের ঘন আস্তরণকে সরিয়ে সূর্য তার সোনালি হাসি নিয়ে আবির্ভূত হল। অনেক লোকের মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস দেখা গেল।
তারেক সকালে ছাদ থেকে নীচে নেমে এল। সারা মোড়ে লোকে লোকারণ্য। দিপু এসে দাঁড়াল ওর সামনে। বলল, লোকের লজ্জা শরম সব হারিয়ে গেল, ভাই। লোকের সামনেই ছাদের ধারে বসে বসে জোয়ান জোয়ান মেয়েরা প্রকাশ্য পায়খানা করে যাচ্ছে। এমনকি একজন ছাদের উপরে বসে খাচ্ছে তো আর একজন বসে বসে পায়খানা করছে। কেউ কেউ আবার ঘরের ভিতরেই পায়খানা করে বসেছে। এসবই মেয়েদের কাজ। তাছাড়া ওরা যাবেই বা কোথায়? ওরা তো আমাদের মত কলার মাড় ভাসিয়ে কোন বাগানের দিকে বা কোন মাঠের দিকে গিয়ে পানি খরচ করতে পারবে না। অগত্যা যা করার এখানেই করতে হচ্ছে। কি বেশরমের দিন এলো, ভাই। বলতেও লজ্জা করছে। গত রাতে স্কুলের ঘরগুলোতে কে যে কার কাছে শুয়ে ছিল তাও বলা মুসকিল। অনেকে তো বাড়ি থেকে কাপড় চোপড়ও বের করতে পারেনি। বানের ভয়ে খালি হাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।
এমন সময় আকবরও এল। ওর বাড়ি স্কুল মোর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। ওরাও এই স্কুলে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ও বলল, বল ভাই, কেমন আছ?
তারেক বলল, এখন আমরা সকলেই একি রকম, ভাই। তার মধ্যে কিছু হেরফের হয়তো আছে। কেউ কেউ হয়তো একটু ভাল আছে। যেমন আমি। আমি যেখানে আছি সেখানে গ্যাঞ্জামটা কম। যাহোক, তোমাদের দিকের খবর বল, ভাই।
তারেক বলল, কি খবর?
— মাস্তারকে তো চিনো। ও কাল সারা দিন সারা রাত ওই পাড়া থাক্যা আসেনি।
— ও কি করছিল?
— কিসের জন্য?
— কুন্ঠে কি ভাস্যা যাচ্ছে তাই দেখ্যা বেড়াচ্ছিল। ম্যালায় রাতে নাকি বাগানের ভিতর দিয়্যা একটা জোয়ান মেয়্যার লাশ ভাস্যা যাচ্ছিল। মেয়্যাটা দেখতে নাকি খুব সুন্দর। লাশের কিচ্ছু হয়নি। র র কর্যা জ্বলছিল। বাগানে বাঁশঝাড়ে গিয়্যা লাশটা আটক্যা গেলছিল। কি ভাসছে বুল্যা মাস্তার দেখতে গেল। গিয়্যা তো ও অবাক। দেখল মেয়্যাটার হাতে সোনার চুড়ি, গলায় সোনার মালা, কানে সোনার দুল। মাস্তার ওই মরা মেয়্যাটার গা থাক্যা একটা একটা করে সব খুল্যা লিল। তারপর বাঁশের ঝাড় থাক্যা লাশটা আবার স্রোতের মুখে ঠেল্যা দিল।
তারেক বলল, তাই! সাহস তো কম নয়।
আকবর বলল, সত্যি সাহসের তারিফ করা যায় না। ওদিকে ফজলকেও তো চেনো?
দিপু বলল, উ আবার কি করল?
ও নাকি একটা বাক্স পায়্যাছে। মাঠের মধ্য দিয়্যা বাক্সটাও বানে ভাস্যা যাচ্ছিল। বাক্সটাকেও টান্যা আন্যা খুল্যা মাল্যায় কিছু পায়্যাছে। ওতে নাকি কিছু সোনাদানাও ছিল।
তারেক বলল, সবাই যখন বানের হাত থেকে বাঁচতে চায়ছে তখন ওরা জীবনকে বাজি রেখে এসব কাজ করে বেড়াচ্ছে? সাহস বটে!
সে হসপিটালের কাছাকাছি যেতেই দেখল হসপিটালের মাঠ পানিতে থৈথৈ করছে। সেই গলা পর্যন্ত পানি ভেঙ্গে কয়েকটি লোক একটি লাশ নিয়ে রাস্তার দিকে আসছে।
সবুরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল যে, গতকাল জমেলা বুড়িকে এই পরিত্যক্ত হসপিটালের একটি ঘরের সানসেডে রেখে তার নাতিরা চলে আসে। আর খোঁজ নেওয়া হয়নি। আজ খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে বুড়ি মরে পড়ে আছে।
পাশ থেকে একসাদ বলল, হসপিটালের ছাদে রুহুলের স্ত্রীর একটা বাচ্চা হয়েছে।
তারেক কিছুক্ষণ একসাদের দিকে তাকাল, তারপর মাঠের দিকে। সারা মাঠে ঘোলা পানি তইথই করছে। দূরের গাছগুলি গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আর, আরও দূরে ভাঙা, বীভৎস জীবন নিয়ে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামগুলি। কত মানুষের কান্না, কত মানুষের ব্যাথা, কত মানুষের দীর্ঘশ্বাস ভেসে যাচ্ছে এই বন্যার ঘোলা পানিতে।
