সাপের ছোবলে সাঁপুড়ের মৃত্যু
কলমে: মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
সমাজ কখনও হঠাৎ করে বদলে যায় না। পরিবর্তন ধীরে ধীরে আসে। আমরা সেই পরিবর্তনকে অনেক সময় বুঝতে পারি না। আমরা ভাবি সব ঠিক আছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে জমতে থাকে বিপদ। সেই বিপদ একদিন আচমকা ছোবল মারে। তখন আমরা অবাক হয়ে যাই। প্রশ্ন করি কেন এমন হল। কিন্তু তখন আর সময় থাকে না। আজকের রাজনীতি ঠিক এই জায়গাতেই এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা যে ব্যবস্থাকে তৈরি করেছি সেই ব্যবস্থাই আজ আমাদের আঘাত করছে। যে শক্তিকে আমরা নিজের স্বার্থে বড় করেছি সেই শক্তিই আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই বাস্তবতা খুব কঠিন। কিন্তু এটিকে অস্বীকার করা যাবে না।
আমরা দেখছি ক্ষমতার লোভ কীভাবে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করছে। আমরা দেখছি দলীয় স্বার্থ কীভাবে জনস্বার্থকে চাপা দিচ্ছে। আমরা দেখছি প্রতিষ্ঠানগুলি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা দেখছি প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই সব কিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিবেশে সত্য কথা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিবেশে ন্যায় বিচার প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। কিন্তু এই অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি।
দীর্ঘদিনের আপস এবং নীরবতা এই পরিস্থিতিকে তৈরি করেছে। আমরা যখন অন্যায় দেখেও চুপ থেকেছি তখন আমরা এই বিপদের বীজ বপন করেছি। আমরা যখন সুবিধার জন্য সত্যকে এড়িয়ে গেছি তখন আমরা এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছি। আজ সেই ব্যবস্থাই আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা নিয়ে। এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে আমরা কোথায় ভুল করেছি।
এই বাস্তবতা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে যে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তার ফল একদিন ভয়ঙ্কর হয়। এই শিক্ষা খুব কঠিন। কিন্তু এই শিক্ষা থেকে পালানোর উপায় নেই। কারণ ইতিহাস বারবার এই কথাই বলে। যে আগুন আমরা জ্বালাই সেই আগুন একদিন আমাদের ঘরই পুড়িয়ে দেয়। এই সত্য আজ আবার সামনে এসেছে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে আমরা কী চাই। আমরা কেমন সমাজ চাই। আমরা কি এমন এক সমাজ চাই যেখানে ভয় থাকবে। না কি এমন এক সমাজ চাই যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। কারণ দায়িত্বও আমাদেরই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এখানে নৈতিকতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। রাজনীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খেলায় জেতাই একমাত্র লক্ষ্য। এই খেলায় সত্য মিথ্যা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। এই খেলায় মানুষের আবেগকে ব্যবহার করা হয়। এই খেলায় বিভাজন তৈরি করা হয়। ধর্মের নামে বিভাজন হয়। ভাষার নামে বিভাজন হয়। পরিচয়ের নামে বিভাজন হয়। এই বিভাজন খুব বিপজ্জনক। কারণ এটি সমাজকে দুর্বল করে। এটি মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। এই অবিশ্বাস গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। আমরা দেখছি কিভাবে সাধারণ মানুষ এই রাজনীতির শিকার হচ্ছে। আমরা দেখছি কিভাবে যুব সমাজ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আমরা দেখছি কিভাবে শিক্ষিত মানুষও অনেক সময় ভুল তথ্যের ফাঁদে পড়ছে। এই পরিস্থিতি খুব উদ্বেগজনক। কারণ একটি সুস্থ সমাজের জন্য সচেতন নাগরিক প্রয়োজন।
কিন্তু যখন তথ্য বিকৃত হয় তখন সচেতনতা নষ্ট হয়। তখন মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা আমরা প্রতিদিন দেখছি। আমরা দেখছি কিভাবে প্রশ্ন তোলাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। আমরা দেখছি কিভাবে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা খুব বিপজ্জনক। কারণ সমালোচনা ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। সমালোচনা ছাড়া সত্য সামনে আসে না। কিন্তু যখন সমালোচনাকে দমন করা হয় তখন ভুল আরও বাড়ে। তখন অন্যায় আরও শক্তিশালী হয়। তখন সমাজ এক অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। কারণ তখন মানুষ ভয় পায়। তখন মানুষ চুপ করে যায়। তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কমে যায়। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য এক বড় সংকট। তাই এই সময়ে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে নীরবতা কখনও সমাধান নয়। নীরবতা অনেক সময় সমস্যাকে আরও বাড়ায়। তাই কথা বলতে হবে। যুক্তি দিয়ে কথা বলতে হবে। তথ্য দিয়ে কথা বলতে হবে। তবেই এই অন্ধকার কাটানো সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে সাঁপুড়ের গল্পটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। সাঁপুড়ে সাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে সাপের সঙ্গে খেলে। সে জানে সাপের আচরণ। কিন্তু তারপরও একদিন সেই সাপই তাকে ছোবল মারে। কেন এমন হয়। কারণ নিয়ন্ত্রণের সীমা আছে। কারণ বিপদের সঙ্গে খেলতে গেলে একদিন বিপদই জিতে যায়। আজকের রাজনীতিতেও আমরা একই চিত্র দেখছি। আমরা দেখছি যারা ক্ষমতার খেলায় মেতে উঠেছে তারা অনেক সময় ভাবছে তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তারা ভাবছে তারা পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে চালাতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়। যখন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয় তখন সেই অন্যায় একদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যখন বিভাজনের রাজনীতি করা হয় তখন সেই বিভাজন একদিন আগুন হয়ে ওঠে। যখন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয় তখন সেই ভয় একদিন সবার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। এই সত্য খুব স্পষ্ট। কিন্তু অনেক সময় আমরা তা দেখতে চাই না। আমরা নিজেদের স্বার্থে চোখ বন্ধ রাখি। আমরা ভাবি সমস্যা অন্য কারও হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যা সবার হয়। এই বাস্তবতা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ যদি আমরা এখনই না বুঝি তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তখন আর ফিরে আসার পথ থাকবে না।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হল আত্মসমালোচনা। আমাদের নিজেদের ভুল স্বীকার করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কোথায় আমরা ভুল করেছি। আমাদের বুঝতে হবে কিভাবে আমরা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছি। এই উপলব্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই উপলব্ধি ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবর্তনের জন্য সাহস দরকার। সত্যকে মেনে নেওয়ার সাহস দরকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দরকার। এই সাহসই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই সাহসই আমাদের একটি সুস্থ সমাজ গড়তে সাহায্য করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা আমাদের একটাই কথা মনে করিয়ে দেয়। সমাজ একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। এখানে প্রত্যেক মানুষের ভূমিকা আছে। আমরা যদি দায়িত্ব এড়িয়ে যাই তাহলে সমস্যা বাড়বে। আমরা যদি অন্যায়কে মেনে নিই তাহলে অন্যায় আরও শক্তিশালী হবে। আমরা যদি প্রশ্ন না করি তাহলে ভুল আরও বাড়বে। তাই আমাদের সক্রিয় হতে হবে। আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে গণতন্ত্র কেবল একটি ব্যবস্থা নয়। এটি একটি চর্চা। এটি একটি মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধকে রক্ষা করা আমাদের কাজ। এই কাজ সহজ নয়। কিন্তু এই কাজ ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। আজকের পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে।
এই আয়নায় আমরা আমাদের ভুল দেখতে পাচ্ছি। আমরা আমাদের দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি। এই আয়নাকে ভেঙে ফেলে লাভ নেই। এই আয়নাকে ব্যবহার করতে হবে। এই আয়না আমাদের শেখাতে পারে কিভাবে আমরা নিজেদের বদলাতে পারি। কিভাবে আমরা একটি ভালো সমাজ গড়তে পারি। এই পথ কঠিন। কিন্তু এই পথই একমাত্র পথ। কারণ অন্য পথ আমাদের আরও অন্ধকারে নিয়ে যাবে। তাই আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি সেই অন্ধকারে যাব। না কি আমরা আলো খুঁজব। এই সিদ্ধান্ত আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই সিদ্ধান্তই ঠিক করবে আমরা কেমন সমাজে বাঁচব। তাই এখনই সময়। এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
Tags:
সাহিত্য-প্রবন্ধ
