i অণুগল্প: বান

অণুগল্প: বান

(অণুগল্প)
বান
    রাহুল পারভেজ
 
গঙ্গা পদ্মা ভৈরব কলকলির ক্ষিপ্ত ঘূর্ণিস্রোত উত্তর পশ্চিম থেকে সাঁই সাঁই ছুটছে দক্ষিণে। রোডের উপর কোথাও এক হাঁটু জল কোথাও কোমরব্দি। সঙ্গে হপ্তাভরব্যপী টানা বৃষ্টির ঢল। জলময় ব্লক প্রাঙ্গন। অফিসের চেয়ারের পায়া তক ছুঁই ছুঁই করছে। বেতার বুলেটিনে ঘন ঘন বিপদ বার্তা ঘোষিত হচ্ছে।

বিডিও বিপদভঞ্জন মন্ডল বানভাসি মানুষের বিপদ ভঞ্জন করতে দুই সহকারি সহ মাইকিং করছেন। " সাবধান সাবধান! ফারাক্কা থেকে আরও বিশ লক্ষ কিউসেক জল ছাড়া হবে। আপনারা বাঁধপুল কিম্বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিন। আজ রাতে আরও বহু গ্রামে বানের জল ছড়িয়ে পড়বে।  সাবধান সাবধান!
 
শিবনগর মোড় পৌঁছানো মাত্র ছুটন্ত স্রোত আর জীপের গতির সংঘর্ষে কয়েকটি মাটির বাড়ি হুড় মুড় করে শুয়ে পড়ল। হাঁটু জলে দন্ডায়মান একদল মানুষের জটলা থেকে আওয়াজ উঠল, 'ধর সুমুন্দির ব্যাটারাকে ধর'! ড্রাইভার দ্রুত জীপ চালাতে গিয়ে এক রাম পাঁঠার ঠ্যাং পিষে দিতেই পাঁঠাটি পোঁ পোঁ আর্তনাদ করে উঠল।

পাঁঠার চিৎকারে ছুটে এলেন অশীতিপর এক বৃদ্ধা। এলাকার সর্বজন খ্যাত ঝাইটন বেওয়া। জিপের সামনে দাঁড়িয়ে ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে, দুই তালু ভাঁজ করে হিস হিসানি সাপের ফণা উঁচিয়ে বলতে লাগল, ওগো শগুন নাম্নিওয়ালারা আমার আম পাঁঠাটাকে শেষ কোরে দিল গো! তুমরা হারামিগুলারে ধর গো! ধর! ধর!

বুড়ির কথা সত্য। ঐ পাঁঠাটাই তাঁর একূল ওকূল। এলাকার ছাগিদের বাচ্চা পয়দার একমাত্র কারিগর। বিনিময়ে এক পোয়া ছোলা, চার আনা নগদ নজরানা তাঁর হাতে আসে। এক মা মরা নাতনি কে নিয়ে বুড়ির
সংসার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে।

লোকজন ঘিরে ফেলল বিডিও বিপদের  জীপ। কাদা পায়ে জীপের মাথায় উঠে লম্ফ ঝম্ফ শুরু করল। বিডিওর ড্রাইভার বলল,  আপনারা নামুন ভাই... নামুন। যা হবার হয়ে গেছে। আমরা আখেরীগঞ্জ থেকে ফিরে এসে যা হোক একটা মীমাংসা করে দিব। বৃদ্ধা চিৎকার করে বলল, বিচার সালিশ না করে কাউকে আমি যেতে দিব না!

সেই সময় মঞ্চে প্রবেশ করল অঞ্চল প্রধান আকিজ আলী। ফিসফিস করে বিডিওর কানে কানে বলল, স্যার, যা হোক কিছু নগদ দিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে যাবে। আমি পঞ্চায়েত থেকে ১০ কেজি চাল একটা কালো ত্রিপল দিয়ে দেব। তাহলেই বুড়ি ঠান্ডা হয়ে যাবে। বিডিও বিপদ পকেটে
হাত ঢুঁকালেন।

আকিজ বৃদ্ধাকে বলল, শুনো দাদি, বিডিও সাহেব তুমাকে এই নম্বরীটা দিচ্ছেন। এই লাও ধর। আর বান নেমে গেলে বাড়ি ভাঙ্গার টাকাও পাবা। এখন ঠান্ডা হও। আর বাড়ি গিয়া তুমার পাঁঠার টেংরিতে হলুদ বেটে ন্যাকড়া জড়িয়ে বেধে দিও। জোড়া লেগে যাবে। লাও  টাকাটা আঁচলে বেঁধে রাখবো।

বৃদ্ধা মুচকি হেসে বলল, সত্যিই দিবা তো ! না গত বারের মত ভোট লিবার লাইগা চাটকি মারছো!

Post a Comment

Previous Post Next Post