i অর্থনীতির মহাসংকট: দেশ কি সত্যিই এক অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে?

অর্থনীতির মহাসংকট: দেশ কি সত্যিই এক অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে?

 
অর্থনীতির মহাসংকট: দেশ কি সত্যিই এক অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে?

কলমে: রূপালী রায়

​বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশ এক চরম অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি। যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমাদের দেখানো হয়েছিল, আজ বাস্তব চিত্রটা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নিচে এই গভীর সংকটের প্রতিটি দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

​১. দায়িত্ব নেওয়ার অভাব ও অর্থশাস্ত্রীদের ক্ষোভ: 

বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে গেলেও কেউ তার সঠিক দায়িত্ব নিতে রাজি নন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যেসব অর্থনীতিবিদ, মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরা সরকারের নীতিকে সমর্থন করেছিলেন (যেমন উরজিৎ প্যাটেল, অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম বা সুরজিৎ ভাল্লা), আজ তাঁরাই বর্তমান ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করছেন। বিমুদ্রাকরণ (নোটবন্দি) বা জিএসটি-র মতো বড় সিদ্ধান্তের সময় যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁরা আজ বুঝতে পারছেন যে দেশের অর্থনীতি এক ভুল দিশায় চালিত হচ্ছে। কিন্তু আজ এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে, তা নিয়ে সকলেই নীরব। 

​২. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বনাম অর্থনৈতিক অস্থিরতা:

দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত মজবুত। শাসক দল একের পর এক নির্বাচন জিতে চলেছে এবং এর ফলে কোনো বিরোধী দল বা সামাজিক সংগঠনও জোরালো আওয়াজ তুলতে পারছে না। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ও এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সিলমোহর দিয়েছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি এটাই যে, দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা যত বাড়ছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ঠিক ততটাই তীব্র হচ্ছে। নির্বাচন জেতাই এখন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়।

​৩. ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্নভঙ্গ এবং শেয়ার বাজারের পতন: 

২০১৭ সালে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে এবং ২০৩২ সালের মধ্যে তা ১০ থেকে ১৫ ট্রিলিয়ন পার করবে। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও দেশের অর্থনীতি ৪ ট্রিলিয়নের আশেপাশেই আটকে রয়েছে। এমনকি ভারতের শেয়ার বাজারের নেটওয়ার্ক আজ তাইওয়ানের মতো একটি ছোট দেশের থেকেও নিচে নেমে গেছে। তাইওয়ানের শেয়ার বাজারের নেটওয়ার্ক যেখানে ৪১৫ লাখ কোটি টাকা, সেখানে ভারতের নেটওয়ার্ক মাত্র ৪১৩ লাখ কোটি টাকা। এর মূল কারণ বর্তমান প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের চরম অনীহা ও বিনিয়োগের অভাব।

​৪. কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এবং কর্পোরেটের আধিপত্য:

দেশে আজ 'জবলেস গ্রোথ' বা কর্মহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরম রূপ ধারণ করেছে। সাধারণ ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা আজ শুধুমাত্র খাতার কলমেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দেশের মিডিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল—সবকিছুকেই আজ এক একটি বিজনেস মডেল বা কর্পোরেট ব্যবসার মতো দেখা হচ্ছে। সরকারি সম্পদ বা কোম্পানিগুলোকে জলের দরে বেসরকারি বা কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বেসরকারি পুঁজিপতিদের সম্পদ হু হু করে বাড়লেও সাধারণ মানুষ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

​৫. মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা:

করোনার পরবর্তী সময় থেকে অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো বড় বিপর্যয় না থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় টাকার মূল্য ডলারের তুলনায় প্রায় ২০% হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে ভারতীয় মুদ্রা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সাথে দেশে উৎপাদন ও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশের সাধারণ মানুষকে চড়া দামে তেল কিনতে হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের পকেট ফাঁকা করার মূল কারণ।

৬. কৃষি ক্ষেত্রের অবহেলা ও পরিকাঠামোর অভাব:

দেশকে বাঁচিয়ে রাখে যে কৃষক সমাজ, সেই কৃষি ও কৃষি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই সরকার সবচেয়ে কম বিনিয়োগ করেছে। সেচের সঠিক পরিকাঠামো কাগজে-কলমে ৬৩% দেখানো হলেও বাস্তবে বিভিন্ন রাজ্যের তথ্য মেলালে তা মাত্র ২৭%-এ আটকে রয়েছে। সার বা সারের সঠিক বণ্টন ব্যবস্থার অভাবে আজ চাষিরা সংকটে। দেশের মূল পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ আজ প্রায় গায়েব, সবকিছুই লাভ-ক্ষতির অঙ্কে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
 

​৭. ঋণের মহাসমুদ্র ও আইএমএফ-এর শর্ত:

দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বা পরিকাঠামো গড়ার নামে বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আইএমএফ (IMF) থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ আজ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ লাখ কোটি টাকা ছুঁতে চলেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে পূর্ববর্তী ঋণের সুদ মেটানোর জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। এর ফলে আইএমএফ এখন দেশের ওপর বিভিন্ন কঠোর শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, যা দেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক নীতিকে দুর্বল করছে। 

​৮. একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক নেতৃত্বের সন্ধান:

বর্তমানে দেশের এই চরম দিশাহীনতা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে দেশ আজ এমন একজন দায়িত্বশীল ও নির্ণায়ক ব্যক্তির সন্ধান করছে, যার ওপর দেশের মানুষ, বাজার, বড় শিল্পপতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারে। ভুল নীতি বা ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রেখে শুধু 'পজিটিভ খবর' বা প্রচারের মাধ্যমে যে একটি দেশ চলতে পারে না, তা আজ স্পষ্ট।

Post a Comment

Previous Post Next Post