i পাক্ষিক কবিতা উৎসব

পাক্ষিক কবিতা উৎসব

সন্ধ্যা নদী

— চারুন রথিক

সন্ধ্যা হলে এ পাড়ায় কেউ আসে না।
কেউ আসুক আর না আসুক,
আমি তো আসি, বনরূপা, তোমার ডাকে।
   
অন্য সব পথের মতো এ পথেও বাঁক আছে।
আর যাওয়ার পথটা বাঁকা বলে
আমাকেও বেঁকে যেতে হয়েছে।
একদিন সূর্যকেও শিখতে হয়েছে পৃথিবীর ভাষা।
তবুও আফিম গাছের ছায়ায় বসে
রূপকথার রাজকন্যা পাওয়ার আশায় ঢেঁকুর তুলিনি।
   
যখন উর্বশী নীলিমার প্রান্তরেখা ছুঁয়ে,
সম্পর্কের বুনোটে বুনোটে দূরন্ত অনুতাপ নিয়ে,

আমার সূর্যমুখী বেদনার শিখর ডিঙিয়ে,
এক অজানা, অচেনা, এক সুদূর,
এক অধরা সুখের নীড় পিছনে ফেলে
শেষ করেছি আমার ভাবের পরকীয়া,
তখনই শুরু হয় আমার একচল্লিশ পৃষ্ঠার প্রেম।

তবুও আমাকে এবং তোমাকেও,
আর হাজার হাজার পথচারীকেও
এটা মেনে নিতে হবে, সব মুখই অচেনা,
সম্পর্কের সব বুনোটই নড়বড়ে,
  রাতের আঁধারে বোনা,
ভোররাতের দিকে শেষ হওয়া, এক মাকড়সার জাল।
*****

অন্ধকার গহ্বর

     — নন্দন আকাশ

প্রতিদিন রাত্রির মত গভীর হয়ে উঠছে দেশ
নদীর দুকূল ছাপিয়ে যে জল বয়ে যায়
এই উঠোন, ঘর বারান্দায় শ্যাওলা জমে
কোন অবাধ্যতার পাপে মুড়িয়ে
ইয়াযুয মাযুযের মত পাহাড় চেটে যাচ্ছি
অন্ধকার গহ্বর, ফেরাউনী রাজ, সেই একই সকাল!

দাঁতে দাঁত কেটে, ক্ষয়ে যাচ্ছে দাঁত
ঝুলে পড়েছি সময়ের ফাঁসে!

শেয়ালি রাত্রির খেয়ালিতে
সূর্য নেই, দিন যায় জুতোর শুকতল ক্ষয়ে!
****

তখনও আমি ছিলাম

— আজিজুল হাকিম

তবুও তো আমি ছিলাম,
না থাকার অন্ধকারে —
অনস্তিত্বের মাঝে
অস্তিত্বের নিয়তিতে।

বিশ্বের ধুলোবালিতে
আর তাদের ঘামে
আমি গলে যাই
মহাশূন্যের বুকে—
যেখানে জন্ম আর মৃত্যু
একই শব্দের আলাদা আলাদা উচ্চারণ।

সৃষ্টির ক্যানভাসে
সময়ের চাবুকের কষাঘাত
অদৃশ্য ফরহাদের শৈল্পিক হাতে
হাঁতুড়ি আর ছেনি
ভেঙে ফ্যালে আর গড়ে তোলে
শিরীন পৃথিবী।

খুলে যায় সব দ্বার —

আলো ফোটে,
আলো ফোটতেই থাকে
শুরু হয় রোমাঞ্চকর আদিম সকাল।

কিন্তু আলো ফোটারও অনেক আগে
আমি ছিলাম
আজও আছি —
এক কম্পিত শিহরণ।

মহুলমাধুরী!
তুমিও তো ছিলে;
ছিলে না কি,
সেই ধুলোতে আমার সাথে মাখামাখি?

রচনা: ১৭/০১/২০২৬
*****

ভরসার আলো

— মহম্মদ মফিজুল ইসলাম

অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ জ্বলল এক টিমটিমে প্রদীপ,
যেন শত সন্দেহের ভিড়েও
দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য হাত।
ভাঙা সেতুর উপর রাখা ভরসা মানেই
নদী পার হওয়ার সাহস,
ঝড়ের বুক চিরে দাঁড়ানো
নাবিকের চোখে অটল দিগন্ত।
ভরসা হল বীজ,
যা পাথরের ফাটলেও জন্মায় সবুজ,
রক্তাক্ত মাটিতে খুঁজে আনে অঙ্কুরের কোমল শ্বাস।
এটি সেই নীরব সুর, যা ভাঙা তারেও গান তোলে,
যেন ধ্বংসস্তূপে লুকোনো অচেনা বসন্তের ডাক।
মানুষের হাতের উষ্ণতায় ভরসা ছড়ায় তার আলো,
এবং পৃথিবী আবার শেখে—
হতাশারও একদিন শেষ আছে।
****

ভালোবাসার অসুখ

— ফাতেমা ইসরাত রেখা

তোমাকে ভালোবাসার পর হাজারটা গোলাপ ফুটেছে
পদ্ম দীঘিতে ঝলমল করেছে শত শত নীলপদ্ম।
তোমার তৃষ্ণায় বুকের ভেতর কাঠ ফাটা রোদ্দুর
সারাদিন অপেক্ষার পর অপেক্ষার প্রহর কেটেছে।
কিছু ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়।
কাউকে না পেয়েও পাওয়ার তৃষ্ণায় বুকের মধ্যে ঝড় ওঠে
পৃথিবীর সমস্ত চাওয়া পাওয়ার হিসেব ভুলে শুধু
একটি নামের উচ্চারণই যেনো জীবনের আদ্যোপান্ত পাঠ।

জানি, এখানে অপার্থিব সময় বদলে যায় মুহুর্মুহু
বদলে যায় মানুষের মন, বদলে যায় মানুষ
কিন্তু কেন জানি ভালোবাসার রঙ বদলায় না।
মনে হয় যেনো, এমন না পাওয়া অনুভবেও একটাই চাওয়া
মানুষটি বেঁচে থাক প্রতি মুহূর্তের নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে।
তোমাকে পাবো না জানি, সে সম্ভাবনাও নেই আর
তবুও এই যে প্রহর যাপন, অপেক্ষার দিনলিপি
এ এক অদ্ভুত অনুভূতি যা হৃদয়কে শান্ত রাখে
বাঁচিয়ে রাখে দু'টো মানুষকে দূরত্বের দু'প্রান্তে।

আসলে ভালোবাসা কখনো কোনো নিশ্চয়তা চায় না
এক অজানা অনুভূতি ভেতর থেকে কাছে টানে
কী এক মোহনীয় সুখ সে আত্মিক বন্ধনে!
অজস্র সময় পিছনে ফেলে কেবল এক স্বপ্নের মায়ায়
এগিয়ে চলা এক অজানা গন্তব্যে দ্বিধাহীনভাবে।
বাহ্যত শেষ হয়েও এই অনুভূতির শেষ নেই যেনো
অনন্ত কাল ধরে এই সম্পর্কের কষ্ট কিংবা সুখ
বয়ে নিয়ে চলার এক নীরব প্রতিশ্রুতিতে আজও ভালোবাসি।
*****

রূপোলী নোলক ও নোলক নামের মেয়েটি
— মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

ক্ষুধার্ত বিকেলের রোদ যখন ফ্যাকাশে হয়ে নামে
মাটির শূন্য শানকিতে, নোলক তখন নিথর বসে বসে
অকাল বৈধব্যের পানসে দিনগুলির নিরলস জাবর কাটে!
ওর নাকের সেই রূপোলী নোলকটা আজ শেষ সম্বল,
যা বন্ধক রাখতে গিয়েও জোটেনি এক মুঠো অন্ন।

গ্রামের মোড়লেরা বাঁকা চোখে, ওর হাড় জিরজিরে শরীরের ভাঁজে
তুলতুলে মাংস খোঁজে; অথচ কেউ দেখে না
বৈধব্যের সাদা শাড়িটা কতবার নোনা জলে
ভিজিয়েছে আর শুকিয়েছে।

যে প্রেমিকের ঘামের গন্ধে ও নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেত,
সে আজ কেবলই একমুঠো ছাই,
কবর দেওয়ার কাফনটুকুও জোটেনি যার,
তাকে কোন অধিকারে নোলক আজও মনে রাখে?

পচা ভাতের গন্ধে মাছি ওড়ে,
আর নোলকের কোল জুড়ে থাকা রুগ্ন শিশুটি কাঁদে—
ওর বুকের দুধ শুকিয়ে কাঠ, সেখানে এখন কেবল
এক চিলতে হাহাকার আর পোড়া দীর্ঘশ্বাস।
সমাজের কাছে ও কেবল এক অভিশপ্ত শরীর,
যার ছায়াতেও না কি অমঙ্গল ওঁৎ পাতে।

অন্ধকারে নাকের নোলকটা ছিঁড়ে ফেলতে গিয়ে
ও থমকে দাঁড়ায়, ভাবে— এটাই কি ছিল জীবনের শেষ চিহ্ন?
প্রেম এখানে বিলাসিতা, বেঁচে থাকাটাই এক বীভৎস যুদ্ধ,
যেখানে নোলক প্রতিদিন পরাজিত হয়।
***

Post a Comment

Previous Post Next Post