i অণুগল্প: শেষ পাঁচ মিনিট/মহব্বত

অণুগল্প: শেষ পাঁচ মিনিট/মহব্বত

 
অণুগল্প
শেষ পাঁচ মিনিট
মহব্বত

ট্রেনটা যখন প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল, তখন আকাশটা অদ্ভুত রকমের ধূসর। না পুরো অন্ধকার, না আলো—ঠিক যেমন দীপকের মনটা।
সে জানালার পাশে বসে ছিল। হেডফোন কানে, কিন্তু কোনো গান বাজছিল না। শুধু বাইরের শব্দগুলোকে ব্লক করার একটা অজুহাত।
আজ দুপুরেই ব্রেকআপ হয়েছে। তিন বছরের সম্পর্ক—একটা মেসেজে শেষ।
"তুমি ভালো, কিন্তু আমি আর পারছি না..." এই একটা লাইনে কতগুলো স্মৃতি, কতগুলো স্বপ্ন, কতগুলো ‘আমরা’—সব শেষ।
দীপক চোখ বন্ধ করল। ঠিক তখনই কেউ এসে বলল — “এখানে বসতে পারি?”
কণ্ঠটা নরম, কিন্তু অদ্ভুত পরিষ্কার।
দীপক মাথা নাড়ল। মেয়েটা বসে পড়ল।
হালকা নীল একটা ড্রেস, চুলগুলো খোলা, মুখে কোনো মেকআপ নেই—তবুও চোখ সরানো যায় না। কিন্তু সুন্দর বলেই না… বরং তার চোখে এমন একটা শান্তি, যা অস্বস্তিকর।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর মেয়েটাই বলল— “কাঁদতে ইচ্ছে করছে?”
দীপক তাকিয়ে রইল।
— “তুমি কি mind reader?”
মেয়েটা হালকা হাসল। — “না। তুমি খুব সহজ।”
এই কথাটা শুনে দীপক একটু হেসে ফেলল—আজকের মধ্যে প্রথমবার।
— “সবাই তো বলে আমি complicated।”
— “না… তুমি শুধু নিজের কষ্টটা লুকাতে পারো না।”
এই এক লাইনে যেন দীপকের ভিতরের সব দরজা খুলে গেল।
সে বলতে শুরু করল — ব্রেকআপ… ঝগড়া… ভুল বোঝাবুঝি… নিজেকে দোষ দেওয়া… আর সেই একাকিত্ব, যেটা ভিড়ের মধ্যেও চেপে বসে থাকে।
মেয়েটা কিছু বলছিল না—শুধু শুনছিল।যেভাবে কেউ খুব আপন মানুষ শোনে।
হঠাৎ মেয়েটা বলল— “জানো, যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি চাই, সে-ই আমাদের সবচেয়ে কম বোঝে।”
দীপক মাথা নুইয়ে বলল— — “হ্যাঁ… কিন্তু তার মানে এই না যে কেউই তোমাকে বোঝে না।”
দীপক তাকাল। — “তুমি বোঝো?”
মেয়েটা একটু থামল। তারপর বলল — “হয়তো… অনেকদিন ধরেই।”
দীপক কিছু বুঝতে পারল না। সে শুধু জিজ্ঞেস করল— — “তোমার নাম?”
মেয়েটা জানালার বাইরে তাকাল। ট্রেন তখন একটা ব্রিজ পার হচ্ছিল।
— “দীপ্তি।”
নামটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল।
কেন জানি না, দীপকের মনে হল—এই নামটা সে আগে কোথাও শুনেছে। কিন্তু মনে করতে পারল না।
দীপ্তি হঠাৎ বলল— “যদি কেউ তোমার জন্য সবকিছু চুপচাপ করে যায়, তুমি কি তাকে খেয়াল করো?”
— “মানে?”
— “ধরো, কেউ তোমার খারাপ দিনগুলো গুনে রাখে… তোমার পছন্দগুলো মনে রাখে… কিন্তু কখনও সামনে আসে না…”
দীপক একটু ভেবে বলল — “না… হয়তো না।”
দীপ্তি হাসল। একটা খুব ছোট, খুব ক্লান্ত হাসি।
— “Exactly.”
ট্রেনটা ধীরে ধীরে একটা ছোট স্টেশনে ঢুকতে শুরু করল।
লাউডস্পিকারে স্টেশনের নাম ভেসে এল—কিন্তু শব্দগুলো যেন অস্পষ্ট।
দীপ্তি উঠে দাঁড়াল।
— “আমার নামার সময় হয়ে গেছে।”
দীপকের ভিতরে হঠাৎ অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হল।
— “এত তাড়াতাড়ি?”
— “সময় কখনও বেশি থাকে না…” সে ব্যাগটা কাঁধে তুলল।
দীপক হঠাৎ বলল— — “আবার দেখা হবে?”
দীপ্তি তাকাল।
এই প্রথম তার চোখে জলটা স্পষ্ট দেখা গেল।
— “হয়তো… যদি তুমি এবার খেয়াল করো।”
সে নেমে গেল।
ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
দীপক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল—যতক্ষণ না ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল।

পরের সকাল।
খবরের কাগজটা হাতে নিয়েই তার চোখ থেমে গেল।
একটা ছোট খবর— “রেললাইনের ধারে এক তরুণীর দেহ উদ্ধার—নাম দীপ্তি।”
দীপকের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে পুরো খবরটা পড়ল— “বন্ধুদের মতে, দীপ্তি দীর্ঘদিন ধরে এক তরুণকে ভালোবাসত—নাম দীপক। কিন্তু কোনোদিন বলতে পারেনি। গতকাল তাকে শেষবার স্টেশনের কাছে দেখা যায়।”
দীপকের হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। তার মাথার ভিতর শব্দগুলো ঘুরতে লাগল— "হয়তো… অনেকদিন ধরেই।"
"যদি তুমি এবার খেয়াল করো…"
হঠাৎ একটা পুরনো দৃশ্য মনে পড়ল—
স্কুলের করিডোর…
একটা মেয়ে দূর থেকে তাকিয়ে আছে…
প্রতিদিন… একই জায়গায়…
নামটা…
দীপ্তি।

শেষ দৃশ্য

দীপক আবার সেই ট্রেনে বসে। একই সিট। একই জানালা। শুধু পাশে কেউ নেই।
সে ফিসফিস করে বলল— “তুমি তো সবসময়ই ছিলে…”
তার চোখ বন্ধ হয়ে এল।
— “আমি শুধু কখনও খেয়াল করিনি…”
বাইরে ট্রেনটা আবার একটা স্টেশন পার করল।
লাউডস্পিকারে নাম ভেসে এল।
এইবার শব্দটা পরিষ্কার— ঠিক সেই স্টেশন… যেখানে দীপ্তি নেমেছিল।

Post a Comment

Previous Post Next Post