কোলান রাধাকান্তপুর মৌজার মধ্যস্থলে কোলান পীর বুরহান বিদ্যাপীঠ উচ্চ মাধ্যমিক হাই স্কুলটি অবস্থিত। এই স্কুলের চারপাশে কোলান গ্রামের বিভিন্ন পাড়া সবুজের শিহরণে উদ্বেলিত। এর পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে কোলান কাশীপুর পাড়া, উত্তরে কোলান বেলদার পাড়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লক্ষীনারায়ণপুর অবস্থিত। লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামটিকে গ্রাম না বলে উপ-গ্রাম বলায় ভাল। কারণ এটি কোলান রাধাকান্তপুর মৌজার মধ্যে অবস্থিত। আর সরকারি মতে মৌজাকেই গ্রাম বলা হয়। এই ইস্কুলের পশ্চিমে একটি বড় পুকুর আছে এবং তারপরে একটি আম বাগান, তারও পশ্চিমে এই স্কুলের খেলার মাঠ। এর দক্ষিণ দিকে পরপর দুটি পুকুর এবং স্কুলের সামনেই গ্রাম পঞ্চায়েত আর কোলান হসপিটাল অবস্থিত। গ্রাম পঞ্চায়েতের পিছনে এবং হসপিটালের পশ্চিমে একটি অতি প্রাচীন বটগাছ আছে।
স্কুলটি ১৯৫৯ সালের ৪-র্থ এপ্রিল স্থাপিত হয়। কিন্তু এটি হঠাৎ করে এখানে স্থাপিত হয়েছে তা নয়; কোন মানুষের স্বপ্ন, কোন মানুষের ভাবনা, কোন মানুষের পরিকল্পনা এবং কোন কোন মানুষের কঠিন পরিশ্রম — এগুলো দিয়েই এই স্কুলটি ঠিক মাটির প্রদীপের মত আলোর দিশারী হয়ে এখানে জ্বলে উঠেছিল।
তখন এই এলাকার একটিও রাস্তায় পিচ তো দূরের কথা মোরাম পর্যন্ত পড়েনি। এমনকি রাস্তাগুলোতে সরকারি উদ্যোগে কোন মাটিও তোলা হয়নি। সেই সময় রাস্তাগুলো অবশ্য বর্ষাকালে নালার কাজ করত। পাড়ার সমস্ত জল সেই নালা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাঠের দিকে চলে যেত। মনে রাখতে হবে, গত ৫০ দশকের কথা বলা হচ্ছে। ভারতবর্ষ কেবল সদ্যোজাত শিশুর মতোই স্বাধীনতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। আমি সেই সময়ের কথা বলছি। আশেপাশে তখনো কোন হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখান থেকে প্রায়ই ১৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর দিকে নশিপুর হাই স্কুল। পশ্চিম দিকে জিয়াগঞ্জে বিজয় সিং হাই স্কুল। আর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এখান থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে হাসানপুর হাই স্কুল এর বাইরে আর কোন হাই স্কুল ছিল না। অবশ্য ব্রিটিশ আমলে কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫-১০ কিলোমিটার অন্তর এক একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামে গড়ে উঠেছিল। সেরকম একটি গ্রাম হল সোনাডাঙ্গা। কোলান মৌজার দক্ষিণে অবস্থিত এরকম একটি গ্রাম হল সোনাডাঙ্গা যেখানে ব্রিটিশ আমলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল।
ওই বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক ছিলেন মোসলেমুদ্দিন, যিনি মোসলেম পন্ডিত নামেও পরিচিত ছিলেন। উনি হাবাসপুর নামক একটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কোলান থেকে যার দূরত্ব প্রায় সতেরো আঠারো কিলোমিটার। সেখান থেকে তিনি পায়ে হেঁটে সোনাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে আসতেন।
তখন বর্ষাকাল। ঘন বর্ষায় চারিদিকের পথঘাট সব জল ও কাদায় একাকার হয়ে গেছে। এরকমই একদিন ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল আর রাস্তাঘাট প্রায় প্লাবিত হয়ে গেছিল। তিনি বাড়ি কিভাবে ফিরবেন সেই বিষয় নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় ওই বিদ্যালয়ের এক ছাত্র, যার নাম সাইদুল ইসলাম — উনি ওই শিক্ষককে বলেছিলেন, "স্যার আজ এই বর্ষায় আপনার বাড়ি যেতে খুব কষ্ট হবে। আপনি আমাদের বাড়িতে থেকে যান।"
সেই দিন থেকে মোসলেমুদ্দীন সাইদুল ইসলামের বাবা হাজী জান মোহাম্মদের বাড়িতে থেকে স্কুল যাতায়াত শুরু করলেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে পীর বুরহানের নাম উঠে আসে। যার নামে প্রায় ৫৩ থেকে ৬৩ বিভাগ জমি আছে বলে শোনা যায়। তার নামে একটি মাদ্রাসা তৈরীর প্রস্তাব উঠে আসে। সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন হাজী জলিল উদ্দিন, হাজী সামসুদ্দিন, তিনকড়ি এবং হাজী সলিমুল্লাহ।
কিন্তু মোসলেমুদ্দীন তাতে রাজি না হয়ে একটি হাই স্কুল তৈরির প্রস্তাব রাখলেন। তারপর সেই বিষয় নিয়ে কয়েকদিন পাড়ায় চর্চা চলল। সেই চর্চা পাড়া ছেড়ে আশপাশের পাড়ায় শুরু হল। প্রথমত: কয়েকজন অরাজি থাকলেও জলিল হাজি প্রস্তাবটি গ্রহণ করে নেন এবং তাদের মধ্যে একটা দীর্ঘ আলোচনা হয়। অবশেষে সকলেই মাদ্রাসার পক্ষে না গিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন।
তাহলে স্কুল কোথায় হবে? চলল জায়গা বাছাই পর্ব। অবশেষে জায়গা পছন্দ হল। সেটি হল তিন পাড়ার মাথায়। অবশেষে ডাক পড়ল মাজেদ আলীকে। যার ডাক নাম পচু বাবু। বড় পুকুরের পূর্ব পাড়ে তার সম্পত্তি। তার কাছে জমি চাওয়া হলে তিনি এক কথায় রাজিও হয়ে যান।
কিন্তু মুখে বললেই তো আর স্কুল তৈরি হয়ে যায় না — টাকার দরকার। পীর বুরহানের যেসব সম্পত্তিগুলো ছিল সেগুলো খাজনা দিয়ে যে টাকা হল, সেই অর্থ খরচ করে স্কুল-বিল্ডিং এর কাজ শুরু হল। বিল্ডিং বলতে বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে খুঁটি ও দেয়াল তৈরি করে উপরে টিনের ছাউনি।
কিন্তু সেই টাকাও যথেষ্ট পরিমাণ হল না। কারণ কাগজপত্র প্রস্তুত আর বিভিন্ন অফিসে ছোটাছুটির জন্য টাকা-পয়সার দরকার। যার কারণে এই গ্রামের বাইরেও অন্যান্য গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাত ধরতে হল।
এসব কাজে যারা মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তারা হলেন মোসলেমুদ্দীন (হাবাসপুর), মহাসিন আলী (আষাঢ়ইয়া দহ), হাজী আব্দুল জলিল, হাজী জানমোহাম্মদ, হাজী সামসুদ্দিন সরকার, তিনকরি, সৈযব আলী সরকার (ডিসি), মাজেদ আলী (পচু বাবু), হাজি দাউদ হোসেন, দারু ওরফে জামসেদ — এদের সকলের বাড়ি কোলান। হাজি সোলেমান মন্ডল, ফাইযুদ্দিন আহাম্মেদ, হাজি ইউসুফ মণ্ডল, আবুল হোসেন সরকার — এরা লক্ষ্মীনারায়ণপুরের অধিবাসী। এছাড়াও তৎকালীন অঞ্চল প্রধান খলিলুর রহমান (তোপীডাঙ্গা), আব্দুস সামাদ (করিমপুর), ডাক্তার ইয়াকুব হোসেন (জীবনপুর), ইদ্রিস আলী মণ্ডল (সোনাডাঙ্গা), মোজাফর হোসেন (সোনাডাঙ্গা), গোলাম পাঞ্জাতন (বোয়ালিয়া), ডাক্তার ইনসান আলী (নারায়ণপুর), ইসমাইল সেখ (ভাণ্ডারা), ইসমাইল মণ্ডল (ভাণ্ডারা), ফারাতুল্লাহ (ভাণ্ডারা)।
এর মধ্যে একটি গল্প লুকিয়ে আছে। স্কুলের স্বার্থে মোসলেমুদ্দিন-এর নির্দেশে একটি মৃত মহিষের চামড়া খালিয়ে সেই চামড়া বিক্রি করা হয়েছিল। যার কারণে সেই সময় মোসলেমউদ্দিন এর প্রতি এলাকায় কিছু ব্যাক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল। যার কারণে একটি বিশাল সালিশি সভা বসে। সেই সভায় তাকে প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।
এ তো হল স্কুল প্রতিষ্ঠার পালা। শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে? এবার মোসলেমুদ্দীন ও মহাসিনের নেতৃত্বে শুরু হল শিক্ষক সংগ্রহের কাজ। সৈয়দপুর গ্রাম থেকে গোলাম গাউসকে নিয়ে আসা হল এবং তাকেই প্রথম কোলান পীর বুরহানের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হল। তারপর এলেন নৌশাদ, আরও কয়েকজন। এই স্কুলের দ্বিতীয় প্রধান শিক্ষক হলেন নৈমুদ্দিন শাহ। যার দ্বারায় সরকারের নিকট হতে স্কুল অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। স্কুলটি শুরু হয়েছিল পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীর মাধ্যমে।
এবার শুরু হল ছাত্র সংগ্রহের পালা। উপরে উক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ছাত্র সংগ্রহ করে তাদেরকে স্কুলে ভর্তি করলেন। ছাত্র এল রানিতলা, জীবনপুর, করিমপুর, তোপিডাঙ্গা, সুলতানপুর, কোলান, লক্ষীনারায়ণপুর, সোনাডাঙ্গা বোয়ালিয়া, কামাল চক, নারায়ণপুর ভান্ডারা, আমডহরা, হাজিগঞ্জ, শিবনগর কুড়লডাঙ্গা — এমনকি গুধিয়ার মত অনেক দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে।
এই হল কোলান পীর বুরহান বিদ্যাপীঠের গোড়াপত্তনের ইতিহাস।
— আজিজুল হাকিম
Tags:
সাহিত্য-প্রবন্ধ

আরও বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা চাই।
ReplyDelete