স্বপ্নীল ছেলেবেলায় চৈত্রের মর্মর দিনগুলি
আজিজুল হাকিম
চৈত্র মানেই শুকনো পাতার মর্মর সঙ্গীত। চৈত্র মানেই গাছে গাছে রঙিন কচি পাতার সবুজ, গোলাপি আর রক্তিম হাসি। চৈত্র মানেই চাম কড়ই (শিরীষ) ফলের ঝনঝন গানে সারা মাঠ মুখরিত করে তোলা। চৈত্র মানেই পাকা আর শুকনো ফসলের শিষে শিষে শনশন গান গাওয়া। চৈত্র মানেই অবারিত শূন্য ফাঁকা মাঠে অবাধ বিচরণ। চৈত্র মানেই সারা মাঠ জুড়ে গরু-ছাগলের অবাধ চারণ ভূমি। চৈত্র মানেই মাঠে মাঠে রাখাল বালকদের ডাংগুলি আর ডাংগুলি খেলা। চৈত্র মানেই কারো জমির বুট (ছোলা) তুলে আগুনে পুড়িয়ে উখড়া খাওয়া। চৈত্র মানেই মাঠে মাঠে তাপদাহের বাষ্পীয় চলচ্চিত্র। চৈত্র মানেই বাসন্তিক আগুনের ঝালাস। চৈত্র মানেই সারা বছর পর প্রকৃতির বুকে প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া।
না, না, আজকের চৈত্র মাসের কথা বলছি না। আজ সেই দিনের চৈত্র মাস আর নেই। সেই দিনের অবারিত মাঠে আজ নানার ফসলের দেয়ালে ছয়লাব। আজ উষ্ণতাকে বা সূর্যের প্রখরতাকে বাদ দিলে কখন কোন মাস চলছে তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ছে। কোন সময়ে, কোন ঋতুতে কোন ফসল হবে তাও ঠিক বোঝা যায় না। আজ ১২ মাস নানান ফসলে সজ্জিত থাকে এই সব মাঠ। আজ মাঠে মাঠে এই চৈত্রের দিনে ভুট্টার ভূঁইগুলি সবুজ উল্লাসে নাচে। কেবল নিম, কড়ই, শিমুল, সজিনা আরো কিছু গাছের ডালে ডালে যদি নতুন পাতা না গজাতো; তাহলে তো আজকে চৈত্র মাস বলে ভাবাই যেত না। আজ মাঠের দিকে তাকালে মাঠের বুকে তাপদাহের বাষ্পীয় খেলা চোখেই পড়ে না।
আমি যে চৈত্রবেলার কথা বলছি তা আজ থেকে প্রায় ৩৫-৪০ বছর আগের কথা। তখন চৈত্র মাস মানেই দিগন্ত স্পর্শ করা অবারিত সুদূর বিস্তৃত শূন্য ফাঁকা মাঠ। তখন চৈত্র মাস আসার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠের সমস্ত ফসল তুলে নেওয়া হত। চৈত্র মাসের ১০ থেকে ১৫ দিন পর আর মাঠে কোন ফসল চোখে পড়ত না। ফলে আগামী বৃষ্টির অপেক্ষায় শূন্য ফাঁকা মাঠ প্রহর গুনে যেত দিনের পর দিন। আর সেই সুযোগে গ্রামের যত ছাগল, গরু, মোষ থাকত সেসব প্রাণীগুলো মাঠে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত। দুপুর হলে রাখল বালকেরা সেগুলিকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে আসত। আবার বিকেল বেলায় তারা চলে যেত সেই মাঠে। সেখানে তারা যেমন গরু মোষ চরাত; তেমনি তারা সারাক্ষণ দলে দলে বিভিন্ন খেলায় মেতে থাকত। আর সেসব খেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর্চা হত ডাংগুলি খেলার।
আজকের ছেলে মেয়েরা হয়তো এসব খেলা ভুলেই গেছে। এই খেলাটি হত একটি ছোট্ট ও সরু ডাল; যার দৈর্ঘ্য এক বিদ (প্রায় ছয় ইঞ্চি) আর একটি হাত দেড়েকের মত গাছের ডাল কেটে বানানো লাঠি। বড় ডালটির নাম ডাং আর ছোট্ট ডালটির নাম ছিল গুলি। সেই বড় ডালটি দিয়ে যখন ছোট ডালটিকে মারা হত, সেটি চলে যেত অনেক দূরে। যার হাতে যত জোর থাকতো সে ততই দূরে সেই গুলিকে পাঠাতে পারত। এই খেলাটি খেলতে একটি ছোট্ট গর্ত করা হত। যার নাম ছিল ঘাই। সেই গর্ততে দাঁড়িয়ে ডাঙ দিয়ে গুলিকে মার হত। কয়েকটি ছেলে সেই গুলি কুড়িয়ে সেখান থেকে সেটি চালিয়ে ডাংকে ছুড়ে মারত। যদি লাগতো তাহলে তারা সেই ডাং-গুলি চালাতে পারত। কখনো কখনো যেন গুলি দূরে না যায় তার জন্য প্রতিপক্ষরা পাটকাঠি দিয়ে সেটিকে রক্ষার চেষ্টা করত আর সে চেষ্টা তাদের সফলও হত।
এই খেলার হিসেবও আলাদা ছিল। এক একটা সংখ্যার নাম এক এক রকম। তাদেরকে বলা হত: মুনা, দোনা, তেনা, চারা, পঞ্চ, ছই, গই। এখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে এক থেকে সাত গুনা হত একদম ওদের নিজস্ব ভাষায়। এসব হিসেবেই খেলা গুলি চলত।
চৈতি ফসল তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রামের পাশে বা বাড়ির পিছনে একটি বিশেষ জায়গায় রাখা হতো। সেসব জায়গায় কেবল কোন একজন ব্যক্তি চৈতি ফসল রাখত না। সেখানে কম করে দশ-বারোজন চাষী তাদের ফসল নিয়ে এনে রাখত। অবশ্য আলাদা আলাদা করে। কারণ এইসব কাজে লোকের খুব প্রয়োজন। তাই পরস্পরকে সহযোগিতা করার জন্য তারা এ কাজ করত। আমাদের সমস্ত পাড়া - বলা যেতে পারে এক জায়গায় ফসল তুলত। সেটা হচ্ছে হসপিটালের মাঠ আর পাশে বট গাছের তলা। সেই বটগাছের তলায় আমি অনেক রাত ঘুমিয়েছি।
বিশেষ করে গম জব এই জাতীয় ফসলগুলো সেখানে রাখা হতো। যেখানে রাখা হতো অবশ্য সেই জায়গাটা কোদাল দিয়ে ছিলে ঘাসকে তুলে ফেলা হতো। তারপর গোবর জল এবং ঝাঁটা দিয়ে সেই জায়গাটা লেপা হত। তারপর মাঠ থেকে কেটে আনা গমকে আবার দুভাগ করে কাটা হতো। গমের আগাকে কেটে লেপার উপরে রাখা হতো আর তার গোড়ার দিক দূরে ফেলে রাখা হতো। যা পরবর্তীকালে জ্বালানির কাজ হতো। সকালে সেই গমকে কোপচে (কেটে) রোদে শুকানো হতো। তারপর বিকেল হলে চাষীরা তার ওপরে গরু ঘোরাত। যাকে আমরা মাড়ন মাড়া বলতাম। গম কিন্ত একদিনে আসত না। দুদিন মাড়ার পর উত্তর পশ্চিমের বাতাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। যদি বিকেলবেলায় সেই বাতাস পাওয়া যেত তাহলে গম আর ভুসিকে আলাদা করে আমরা গম বাড়ি নিয়ে আসতাম। এই মাড়ন মাড়িতে গিয়ে আমি অনেকদিন গরুর পিছু পিছু হেঁটেছি।
তারপর সবচাইতে ভালো লাগতো সন্ধ্যা বেলায়। গমের গোড়ার ভাগ যেগুলো জ্বালানি হিসেবে রাখা হতো সেই সব আঁটি আমরা ঘর বানাতাম। তারপর বাড়ি থেকে চাদর বালিশ নিয়ে গিয়ে সেই সব খেলা ঘরে কত রাত কাটিয়েছি। সেইসব দিনগুলির কথা মনে পড়লে আজও রোমাঞ্চল আগে। আজ প্রযুক্তির যুগে এসব স্বপ্ন মাত্র।
চৈতি ফসল উঠে গেলে একদম জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত মানুষের তেমন কোন কাজ থাকত না; যার কারণে সারাদিন ছোট ছেলেদের সাথে যুবক আর বিবাহিত লোকেরাও খেলাধুলা করত। বিশেষ করে আমবাগানে দেখা যেত বড় বড় জোয়ান পুরুষেরা হাডুডু, চামচিকে খেলছে।
তখন গ্রামের ছেলে মেয়েদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রচলন থাকলেও সেভাবে সকলে স্কুল যেত না। পাড়ার শিক্ষানুরাগী মানুষের ছেলেমেয়েরাই কেবলমাত্র স্কুল যেত। যারা স্কুল যেত তারা এই ধরনের খেলাগুলি খুব একটা ভোগ করতে পারত না। কারণ যে সময়ে এই খেলাগুলি হত তখন স্কুলে পড়ার সময়। কিন্তু তারা বিকেল বেলায় ফুটবল খেলতে পেত।
এই চৈতির সময় জ্যোৎস্না রাত হলে তো কোন কথাই নেই। মাঝে মাঝে দুপুর রাত পর্যন্ত ছোট ছোট ছেলেরা বিভিন্ন খেলায় মেতে থাকত। তার সঙ্গে ছোট ছোট মেয়েরাও নানান খেলা খেলত।
ওই জোছনা মাতাল ফিনফিনে রাতগুলি সমস্ত মাঠকে রুপোলি আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলত। মাঝে মাঝে কয়েকজন বাল্য বন্ধুদের সঙ্গে সেই দিগন্ত জোড়া মাঠে বেড়াতে যেতাম। গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে রাস্তার ধারে বসে থাকতাম। সেই জ্যোৎস্নালু সাগরের প্রশান্ত বুক আর নৈঃশব্দিক উল্লাস আমাকে স্বপ্নীল জগতে নিয়ে যেত। দূরের গাছগুলো এক ভৌতিক আর রহস্যময় রূপ পেত। মাঠের সেই অপরূপ শোভার দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিয়েছি।
চৈতি ফসল তোলার সময় যে সব জমিগুলোর উপর দিয়ে গরুর গাড়ি নিয়ে যাওয়া আর আসা হত সেই সব জায়গায় গরুর গাড়ির চাকা আর গরুর পায়ের চিহ্ন পড়ে যাওয়ায় একটা সুন্দর রাস্তা তৈরি হতো। রেল লাইনের মতই দুটো লাইন। এই রাস্তাকে অবশ্য গ্রামের ভাষায় লিক বলা হত। এখনো অবশ্য এই ভাষার কোন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু সেই দিনের অনেক কথা, অনেক শব্দ কালের চাবুক কেড়ে নেয় গেছে। যেভাবে চোখের সামনে থেকে কোন মানুষকে কেড়ে নিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে।
সেই চৈত্র মাসের দিনরাত্রিগুলি আর কখনোই ফিরে আসবেনা আজকের শিশুদের বুকে।তারা বুঝতেই পারে না চৈতি এসে চুপি চুপি চলে গেছে কখন। কেবল আমি স্মৃতির পানশিতে চড়ে চলে যাই সেই চৈতির দেশে; যেখানে আমার বাল্যকাল অম্লান হয়ে হাসে।