পরাজিতের রক্তে
লেখা উৎসব: দুর্গাপূজা ও সাম্রাজ্যবাদের রূপরেখা
— মণি জুয়েল
ইতিহাসের নির্মমতম এবং সবচেয়ে কার্যকর চাতুরী হলো:
বিজয়ী কেবল সামরিক শক্তি বা অস্ত্রের বলে কোনো ভূখণ্ড দখল করে ক্ষান্ত হয় না; সে বিজিতের ভাষা কেড়ে নেয়, তার স্মৃতির ওপর
একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজের রক্তভেজা শোষণের ইতিহাসকে 'ধর্ম', 'সংস্কৃতি' ও 'ন্যায়ের পুনর্প্রতিষ্ঠা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেণিপ্রভুত্বের প্রধান হাতিয়ারই হলো বিজিতের
আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধকে 'অশুভ', 'অসুরত্ব'
বা 'অসভ্য' হিসেবে
চিহ্নিত করা, আর বিজয়ীর হিংস্রতা ও আধিপত্যকে 'দেবত্ব' ও 'পবিত্রতায়'
ভূষিত করা।
বাংলার সর্ববৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা
এবং তার কেন্দ্রস্থিত মহিষাসুরবধের আখ্যানকে কেবল ভক্তি কিংবা নান্দনিক
আনন্দ-উৎসবের আবহে আবদ্ধ রাখলে এর পেছনের গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক সত্যটি অধরাই
থেকে যায়। ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী
বন্দোবস্ত এবং ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক
অর্থনীতি এবং বিশ্বজনীন উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট বোঝা
যায়—দুর্গাপূজার ঐতিহাসিক রূপায়ন প্রকৃতপক্ষে একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক
সাম্রাজ্যবাদ, শ্রেণিগত শোষণ ও ক্ষমতার কাঠামোর উদযাপনী রূপ।
[আন্তর্জাতিক তত্ত্বায়ন ও ঔপনিবেশিক
ক্ষমতার বিন্যাস]
── এডওয়ার্ড
সাঈদ (Orientalism) ──> অনার্য/মহিষাসুরকে 'অসভ্য' ও 'অসুর' হিসেবে 'অন্যকরণ'
(Othering)
── ১৭৫৭
(পলাশির যুদ্ধ ও লর্ড ক্লাইভ) ──> কম্প্রাডোর ক্লাসের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির জয়োৎসব
── ১৭৯৩
(চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত) ──> ওয়ালারস্টাইন ও
বুর্দিয়ো: শোষিত কৃষক-উদ্বৃত্তকে 'প্রতীকী পুঁজি'তে রূপান্তর
── জ্যঁ
বোদ্রিয়ার (Simulacra) ──> নগ্ন শোষণের ওপর 'শুভের জয়'-এর এক কৃত্রিম পরা-বাস্তবতা (Hyperreality)
── গায়ত্রী
স্পিভাক (Subaltern Studies) ──> বিজিত সাঁওতালদের 'হুদুড় দুর্গা' ও অনুচ্চারিত 'দাঁশাই' শোকগাথা
১. 'অসুর'
নির্মাণ ও প্রাক-আর্য বিনাশ: সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ:
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি (Antonio
Gramsci)-র 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য'
(Cultural Hegemony) তত্ত্ব অনুযায়ী, শাসকশ্রেণি
কেবল সামরিক বল প্রয়োগ বা বন্দুক দিয়ে তার রাজত্ব টিকিয়ে রাখে না; সে ঐতিহ্য, ধর্মীয় পুরাণ ও মহোৎসবের মাধ্যমে শোষিতের
মগজে এমন এক 'সম্মতি' (Consent) তৈরি
করে, যাতে অধীনস্থ জনগোষ্ঠী নিজের শৃঙ্খল ও অবদমনকেই
স্বাভাবিক এবং পরম সত্য বলে মেনে নেয়।
উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ (Edward Said)-এর Orientalism এবং ফ্রাঞ্জ ফ্যানো (Frantz
Fanon)-র বিশ্লেষণ দেখায়, কীভাবে
সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিজিত অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে 'অসভ্য',
'পাপাচারী' ও 'দানবীয়'
(Dehumanized) হিসেবে চিত্রিত করে নিজেদের আগ্রাসনকে 'সভ্যতা প্রদানের দায়িত্ব' বা 'ধর্মসংস্থাপন' হিসেবে বৈধতা দেয়। মার্কণ্ডেয়
পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যে প্রাক-আর্য অনার্য প্রতিপক্ষকে অবলীলায় 'অসুর' হিসেবে দেগে দেওয়া এই রাজনৈতিক 'অন্যকরণ' (Othering)-এরই ধর্মীয় ও পৌরাণিক রূপায়ন।
মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক ডি. ডি. কোশাম্বী (D. D. Kosambi) তাঁর গবেষণায় সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন, ভারতের
প্রাক-আর্য অনার্য জনজাতি এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে পরাজিত করে
ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির অধীনস্থ করার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই
মহিষাসুরবধের পৌরাণিক রূপক নির্মিত হয়েছিল।
এখানে সমাজবিজ্ঞানী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri
Chakravorty Spivak)-এর সেই অকাট্য প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—"Can
the Subaltern Speak?" (প্রান্তিক মানুষ কি কথা বলতে পারে?)। বিজয়ীর লেখা ক্যানোনিকাল ইতিহাসে সাবঅলটার্ন বা বিজিতের নিজস্ব কোনো
বয়ান রাখা হয় না।
কিন্তু ইতিহাসের সত্য লুকানো থাকে লোকস্মৃতিতে।
ভারতের নৃতাত্ত্বিক জরিপ (Anthropological Survey of India)-র নথি এবং
ছোটনাগপুর মালভূমির সাঁওতাল ও অসুর জনজাতির মৌখিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা
যায়, তাদের লোকগাথায় মহিষাসুর পরিচিত 'হুদুড় দুর্গা' নামে। তিনি ছিলেন তাদের ন্যায়পরায়ণ
আরণ্যক রাজা, যাকে ছলনার আশ্রয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ফলে
আশ্বিন মাসে যখন বিজয়ী সমাজ দুর্গাপূজার আনন্দে মেতে ওঠে, তখন
সাঁওতাল জনজাতি পালন করে 'দাঁশাই' (Dasai) নাচ—যা প্রকৃতপক্ষে তাদের হারানো প্রিয় বীর রাজাকে
স্মরণ করার এক ট্র্যাজিক ও অনুচ্চারিত শোকগাথা। বিজিতের এই দীর্ঘশ্বাসই প্রমাণ করে,
দুর্গাপূজার মূলে লুকিয়ে আছে প্রাক-আর্য অনার্য সংস্কৃতির ওপর
বিজয়ী সংস্কৃতির এক সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ।
২. ১৭৫৭, পলাশির যুদ্ধ ও ব্রিটিশ তোষণে রাজকীয় পূজার জন্ম:
আধুনিককালে দুর্গাপূজার যে ধামাকাদার, প্রকাণ্ড ও সর্বজনীন রূপ আমরা দেখি, তার ঐতিহাসিক
সূচনা কোনো নিছক নিরাসক্ত ধর্মীয় ভক্তিভাব থেকে ঘটেনি; বরং
তা ঘটেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ তোষণ ও ঔপনিবেশিক আনুগত্য প্রদর্শনের
রাজনৈতিক তাগিদ থেকে।
১৭৫৭ সালে পলাশির প্রাঙ্গণে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের
মাধ্যমে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শোষণের আনুষ্ঠানিক দরজা খুলে
যায়। মির্জাফরের মতো দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের যৌথ চক্রান্তে সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাত
করার পরপরই কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ব্রিটিশ বিজয় উদযাপনে
এক অভূতপূর্ব দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। সেই পূজায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত
ছিলেন স্বয়ং বিজয়ী ব্রিটিশ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ।
* কম্প্রাডোর
বুর্জোয়াজি (Comprador Class): মিশরীয় অর্থনীতিবিদ ও
সমাজবিজ্ঞানী সামির আমিন (Samir Amin)-এর নির্ভরতা তত্ত্ব (Dependency
Theory) অনুযায়ী, যেকোনো সাম্রাজ্যবাদী
শোষণের মূল স্তম্ভ হলো দেশীয় সুবিধাভোগী 'দালাল শ্রেণি'
বা 'কম্প্রাডোর বুর্জোয়াজি'। নবকৃষ্ণ দেব ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেই প্রথম সারির দেশীয়
রাজনৈতিক সহযোগী।
* জ্যঁ
বোদ্রিয়ারের সিমুলাক্রা (Simulacra): ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ
বোদ্রিয়ার (Jean Baudrillard)-এর তত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা
যায়, পলাশির রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা দখল, দেশীয়
শাসককে হত্যা এবং ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন সত্যকে আড়াল করতে 'পবিত্র
শুভশক্তির জয়' নামের এক অলীক পরা-বাস্তবতা বা 'সিমুলাক্রা' তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশদের সামরিক
আগ্রাসনকে এই পূজার মাধ্যমে দেবীর কৃপাধন্য 'ন্যায়ের জয়'
হিসেবে সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে গেঁথে দেওয়া হয়। অর্থাৎ,
আধুনিক দুর্গাপূজার যাত্রারম্ভেই খোদাই করা ছিল ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যবাদের সিলমোহর।
৩. ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: 'প্রতীকী
পুঁজি' ও জমিদারি শোষণ:
১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত
'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' (Permanent Settlement) বাংলায়
এক তীব্র শ্রেণি-বৈষম্যমূলক ও পরজীবী জমিদারি প্রথার জন্ম দেয়। এটি ছিল ব্রিটিশ
সাম্রাজ্যবাদের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ফাঁদ। আর এই
সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর ভেতরে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে প্রজাহারি শোষণের অর্থকে ধর্মীয়
পবিত্রতায় মুড়িয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
(উপাদান, তাত্ত্বিক
ভিত্তি, রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকারিতা, অর্থনৈতিক ভিত্তি) কার্ল মার্ক্স (শ্রেণি-বিশ্লেষণ)
-- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে কৃষকের রক্তঘামে অর্জিত উদ্বৃত্ত
কাড়ে নেওয়া এবং তা পূজার আড়ম্বরে ব্যয় করা।
(সাংস্কৃতিক রূপান্তর) পিয়ের বুর্দিয়ো ('প্রতীকী পুঁজি') -- নগ্ন অর্থনৈতিক শোষণকে 'ধর্মীয় মহিমা' ও আভিজাত্যের সামাজিক মর্যাদায় রূপান্তরিত করা।
(রাজনৈতিক কাজ) আন্তোনিও
গ্রামশি ('আধিপত্য') -- কৃষককে শোষণের
ক্ষোভ ভুলিয়ে 'দেবকর্মের শরিক' বানানোর
মনস্তাত্ত্বিক আচ্ছন্নতা তৈরি করা।
এমানুয়েল
ওয়ালারস্টাইনের বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব (World-Systems Theory): ওয়ালারস্টাইনের তত্ত্ব মতে, সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্র
(Core) প্রান্তিক অঞ্চল (Periphery) থেকে
কাঁচামাল ও অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত শোষণ করে। বাংলায় কৃষকদের কাঁচা রক্ত চুষে সংগৃহীত
রাজস্বের একটি বড় অংশ জমিদার ও মুৎসুদ্দী শ্রেণি ব্যয় করত দুর্গাপূজার জাঁকজমকে।
*পিয়ের বুর্দিয়োর প্রতীকী পুঁজি (Symbolic
Capital): ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো (Pierre
Bourdieu)-র তত্ত্বানুসারে, জমিদাররা কৃষকদের
কাছ থেকে কাড়া অর্থনৈতিক পুঁজিকে (Economic Capital) বিশাল
পূজার আয়োজনের মাধ্যমে 'প্রতীকী পুঁজি'তে রূপান্তরিত করত। কার্ল মার্ক্সের শ্রেণি-বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আলো, বাজনা, রাজকীয় পশু
বলিদান ও প্রকাণ্ড প্যান্ডেলের এই ভয়াবহ আড়ম্বর সাধারণ প্রজাকুলের মগজে একধরনের
ধর্মীয় আচ্ছন্নতা তৈরি করত, যা তাদের শোষণের ক্ষোভকে
ভুলিয়ে দিয়ে জমিদারি শাসন ও ব্রিটিশ আনুগত্যকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখতে
সাহায্য করত।
৪. ১৯০৫ থেকে ১৯৩৭: বায়োপলিটিক্স ও
অভ্যন্তরীণ 'অন্যকরণ':
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন থেকে
শুরু করে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক Provincial
Election (প্রাদেশিক নির্বাচন)—এই পুরো
সময়পর্বে রাজনৈতিক ক্ষমতার টানাপোড়েনে দুর্গাপূজার পৌরাণিক রূপকটি এক বিপজ্জনক
মোড় নেয়।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel
Foucault)-র 'বায়োপলিটিক্স'
(Biopolitics) ও ক্ষমতার কাঠামোগত বিশ্লেষণের আলোকেও একে বোঝা
সম্ভব। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বঙ্কিমচন্দ্র ও অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের হাত
ধরে দুর্গাপূজার প্রতীককে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় রূপ দেওয়া হলেও, সেখানে অবচেতনভাবেই 'অসুর' চরিত্রটির
ওপর মুসলিম ও অনার্য সমাজকে প্রক্ষেপণ করার এক বৈষম্যমূলক প্রবণতা তৈরি হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনকে কেন্দ্র
করে বাংলায় যখন হিন্দু-মুসলিম ক্ষমতার সমীকরণ চরম রূপ নেয়, তখন উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক ভাবাদর্শে মহিষাসুরবধের আখ্যানকে ব্যবহার করে 'মুসলিম শোষকের নিধন'-এর রূপক তৈরি করা হয়। পিয়ের
বুর্দিয়োর 'প্রতীকী সহিংসতা' (Symbolic Violence)-র ধারণা অনুযায়ী, সমাজে একটি নির্দিষ্ট
সম্প্রদায়কে প্রতিনিয়ত 'অসুর' বা ‘চিরন্তন শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপনের এই প্রক্রিয়া
মূলত সাম্রাজ্যবাদী 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and
Rule) নীতিরই সাংস্কৃতিক প্রতিফলন।
জার্মান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেনিয়ামিন (Walter
Benjamin)-এর সেই বিখ্যাত অনুসিদ্ধান্তটি এখানে চিরন্তন সত্য হয়ে
দেখা দেয়—"There is no document of civilization which is not at the
same time a document of barbarism" (সভ্যতার এমন কোনো দলিল
নেই, যা একই সাথে অসভ্যতা ও শোষণের দলিল নয়)। দুর্গাপূজার
চোখঝাঁসানো প্রদীপের নিচে ঢাকা পড়ে থাকা ঐতিহাসিক সহিংসতা ও অবদমনই এর সবচেয়ে
বড় প্রমাণ।
৫. সার্বভৌমত্ব ও সহিংসতার দৃশ্যমান
রাজকীয়তা:
দেবীর 'সিংহবাহিনী' রূপ এবং পদদলিত রক্তাক্ত মহিষাসুরের বুকের ওপর ত্রিশূল বিদ্ধ করার যে
সার্বজনীন প্রতিমা নির্মাণ করা হয়, তা কেবল নিছক শিল্পের
ধর্মীয় সৌন্দর্যতত্ত্ব নয়। এটি হলো শাসক ও বিজয়ীর সহিংসতার এক প্রাতিষ্ঠানিক ও
দৃশ্যমান রাজনৈতিক ভাষা (Iconography of Domination)।
প্রাচীন এসিরীয়, পারসিক এবং পরবর্তীকালে
ব্রিটিশ রাজকীয় প্রতীকে (Royal Coat of Arms) সিংহ সর্বদা
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সামরিক পরাক্রম এবং শত্রুকে পদদলিত
করার ভয়াবহ ক্ষমতার প্রতীক। যখন কোনো দেবমূর্তির পাদদেশে পরাজিত শত্রুকে রক্তাক্ত
ও চিরতরে অবমিত অবস্থায় দেখানো হয়, তখন তা প্রকৃতপক্ষে
শাসকের সহিংসতাকে 'পবিত্র' ও 'ন্যায়সংগত' হিসেবে জনগণের মনস্তাত্ত্বে গেঁথে দেয়।
এই দৃশ্যগত রাজনীতি সাধারণ বিজিত প্রজা বা প্রান্তিক মানুষকে প্রতিনিয়ত ভয় ও
অনুগত্যের বার্তা দেয়—আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র বা শাসনকাঠামোর
বিরুদ্ধে দাঁড়ালে পরিণতি কী হবে।
উপসংহার: পরাভূতের
দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের পুনর্পাঠ
১৭৫৭ সালের পলাশির প্রাঙ্গণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
বিজয় উদযাপন থেকে শুরু করে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি শোষণ এবং
১৯৩৭ সালের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি—দুর্গাপূজার সামাজিক
রূপায়ন ও মহিষাসুরবধের আখ্যানকে কোনোভাবেই সাম্রাজ্যবাদ, ক্ষমতার
রাজনীতি এবং অনার্য সংস্কৃতির অবদমনের ইতিহাস থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়।
সাম্রাজ্যবাদ কেবল সীমানা বা ভূখণ্ড দখল করে ক্ষান্ত
হয় না;
সে মানুষের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে পঙ্গু ও দেউলিয়া করে দেয়। বিজয়ীর
হাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কামান ছিল, চিরস্থায়ী
বন্দোবস্তের আইনি দলিল ছিল, আধুনিক প্রচারমাধ্যম ও ইতিহাস
লেখার প্রেস ছিল। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বলপ্রয়োগ কখনোই তার নৈতিক
শ্রেষ্ঠত্বের অকাট্য প্রমাণ হতে পারে না।
বিজয়ী মানেই সে ন্যায়ের একমাত্র পরম পতাকাধারী নয়; আর পরাজিত বলেই কেউ অনন্তকাল 'অসুর' বা 'অসভ্য' হয়ে থাকতে পারে
না। বিজয়ীর লেখা ক্যানোনিকাল ইতিহাসের অশুভ ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভার বিরুদ্ধে
পরাজিতের অনুলিখিত লোকস্মৃতির এই সংহত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পুনর্ব্যাখ্যাই
হলো প্রকৃত মুক্তির প্রথম শর্ত।
