মানুষের সিংহাসন থেকে অবতরণ
কলমেঃ মণি জুয়েল
মানুষের সবচেয়ে বড় অহংকার কী? সে নিজেকে মানুষ বলে
জানে। তারপর সেই জানাটাকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে। “সবার
উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” কী
আশ্চর্য!
মানুষই বাক্যটি লিখল। মানুষই সত্যের সংজ্ঞা দিল। মানুষই বিচারক। মানুষই
অভিযুক্ত। মানুষই সাক্ষী। এবং শেষে মানুষই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে রায় দিল।
এমন আদালতে মানুষ ছাড়া আর কে জিতবে?
আমি সেই লৌকিক আদালত ভেঙে দিতে চাই। মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়।
মানুষকে অপমান করার জন্য নয়। মানুষকে তার নিজের তৈরি মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে
ছুড়ে ফেলার জন্য। কারণ মানুষ কেন্দ্র নয়। কখনও ছিল না। শুধু মানুষ নিজের চারপাশে
একটি কেন্দ্র এঁকে নিয়েছিল। তারপর সেই কেন্দ্রের নাম দিয়েছিল— সভ্যতা। ধর্ম। যুক্তি। আত্মা। ঈশ্বর। মানবতা। বিজ্ঞান। নৈতিকতা এমনকি
প্রেমও। সবকিছুর শেষ ব্যাখ্যায় এসে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এসব ব্যাখ্যা গুলোকেই প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে।
“অহং ব্রহ্মাস্মি।” আমি ব্রহ্ম। কিন্তু— “আমি” কেন? এই “আমি”-কে এত বিশেষাধিকার কে দিল ? মানুষ নিজের ক্ষুদ্র শরীরের
মধ্যে দাঁড়িয়ে মহাবিশ্বের পরম সত্যকে নিজের আত্মসত্তার সঙ্গে অভিন্ন করে ফেলল। এ এক বিস্ময়কর metaphysical সাহস। কিন্তু –
“আমি” ছাড়া কি ব্রহ্ম অসম্পূর্ণ?
“আমি” না থাকলে কি অস্তিত্বের কোনো ক্ষতি হয়?
একটি পাথর কি তার অস্তিত্বের জন্য আমার consciousness-এর
অপেক্ষায় আছে? একটি নদী কি আমাকে চিনলেই নদী? একটি গাছ কি মানুষের ভাষায় নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করবে? একটি পিঁপড়ের colony কি মানুষের দর্শন না বুঝলে কম
বাস্তব? তাহলে কেন মানুষের “আমি”-কে অস্তিত্বের চূড়ান্ত আয়না বানানো হবে?
প্রশ্ন তো এখানে -
কেন অস্তিত্বের দরজায় মানুষকে দারোয়ান বানানো হয়েছে?
তারপর—
“আনাল হক।” আমি হক। আবারও সেই “আমি”। অসীমের মুখে মানুষের কণ্ঠ। পরমের ভাষায় মানুষের উচ্চারণ। কিন্তু আমার
প্রশ্ন আরও নিষ্ঠুর। যদি মানুষ নিজেকে বিলীন করেও পরমের সঙ্গে একাত্মতার অভিজ্ঞতা
লাভ করে, তবে সেই অভিজ্ঞতার কেন্দ্রেও কেন মানুষ?
মানুষ বিলীন হচ্ছে। মানুষ মিলিত হচ্ছে। মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করছে।
মানুষ মুক্ত হচ্ছে। আবারও মানুষ। আমি এখানেই শেষ ধাক্কাটা দিতে চাই। মানুষের অহং
ভাঙা যথেষ্ট নয়। মানুষের কেন্দ্র ভাঙতে হবে।
“আমি”কে ক্ষুদ্র করা নয়—
“আমি”-র বিশেষাধিকারই বাতিল করতে হবে।
“আশরাফুল মাখলুকাত।” মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। আমি
জিজ্ঞাসা করি— কার মাপকাঠিতে? মানুষের।
কার ভাষায়? মানুষের। কার বিচার?মানুষের।
কার আদালত?মানুষের। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের
বিচারক। এ কেমন hierarchy?
মানুষ বলল—আমি শ্রেষ্ঠ। কারণ আমি শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞা
দিতে পারি। এটা যেন পরীক্ষার্থী নিজেই প্রশ্নপত্র তৈরি করে, নিজেই
উত্তরপত্র পরীক্ষা করে, তারপর নিজেকেই প্রথম ঘোষণা করে।
আমি এই hierarchy-তে বিশ্বাস করি না। একটি মৌমাছি
মানুষের মতো নয়। একটি তিমি মানুষের মতো নয়। একটি অক্টোপাস মানুষের মতো নয়। একটি
ছত্রাক মানুষের মতো নয়। একটি বন মানুষের মতো নয়।
কিন্তু মানুষের মতো নয় মানেই মানুষের নিচে ?
Difference
is not inferiority. Difference is not
hierarchy.
একটি গাছ কথা বলে না বলে তার নীরবতা মানুষের ভাষার চেয়ে নিম্নতর নয়।
একটি পাখি দর্শন লেখে না বলে তার অস্তিত্ব দর্শনের চেয়ে কম নয়। একটি নদী কোনো
ধর্মগ্রন্থ রচনা করেনি বলে তার প্রবাহের কোনো ontological value নেই—এ কথা বলার অধিকার মানুষকে কে দিল? মানুষ। আবার সেই
মানুষ।
মানুষও একটি জিনিস। মানুষ নিজেকে কী ভাবে? একটি বিশেষ সত্তা। একটি পূর্ণ সত্তা। একটি স্বতন্ত্র সত্তা। একটি “আমি”। কিন্তু একটু কাছে গিয়ে দেখো। মানুষের মুখের
থুতুতে জীবন আছে। তার মলে জীবন আছে। তার অন্ত্রে অসংখ্য অণুজীবের বাস। তার ত্বকে
জীবন। তার শরীরে জীবন। তার চারপাশে জীবন। যে মানুষ নিজেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ,
পৃথক, বিশেষ অস্তিত্ব বলে ভাবে—তার নিজের শরীরই সেই ধারণার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়।
মানুষ তার শরীরের ভিতরেও একা নয়।তাহলে মানুষ কী? একটি বিশাল জীবন্ত assemblage। অসংখ্য কোষ, অণুজীব, রাসায়নিক প্রক্রিয়া, জৈবিক সম্পর্ক, পরিবেশ এবং পারস্পরিক নির্ভরতার
সাময়িক বিন্যাস। মানুষ যেমন একটি জীবন্ত সত্তা, থুতুতে থাকা
একটি জীবাণুও তেমনই জীবনের একটি রূপ। মলে থাকা একটি অণুজীবও জীবনের একটি রূপ।
মানুষ আর সেই অণুজীবের মধ্যে পার্থক্য আছে—অবশ্যই আছে।
কিন্তু পার্থক্যকে কেন শ্রেষ্ঠত্বে রূপান্তরিত করতে হবে? একটি
জীব বড় বলে কি সে অস্তিত্বগতভাবে বেশি সত্য? একটি জীব জটিল nervous
system বহন করে বলে কি তার অস্তিত্বের মূল্য অন্য জীবের চেয়ে অসীম
গুণ বেশি? মানুষের উত্তর—হ্যাঁ। কারণ
উত্তরদাতাও মানুষ। এই আত্মসাক্ষ্যই anthropocentrism-এর
সবচেয়ে পুরনো কৌশল ।। আমি সেই কৌশলটি প্রত্যাখ্যান করি। মানুষও একটি জিনিস থুতুতে
থাকা জীবাণুর মতোই—অস্তিত্বের অসংখ্য রূপের মধ্যে একটি রূপ।
মলে থাকা অণুজীবের মতোই—জীবনের বিশাল বহুত্বের একটি ক্ষুদ্র
অংশ।
মানুষের বিশেষত্ব থাকতে পারে।কিন্তু সেই বিশেষত্বকে অস্তিত্বের
সিংহাসনে বসানোর অধিকার কোথা থেকে এলো? মানুষের কাছ থেকে?তাহলে সেই রায় আবার মানুষেরই। আমি সেই রায় মানি না।মানুষকে তাই ছোট করছি
না। মানুষকে অন্য সব অস্তিত্বের পাশে বসাচ্ছি। সিংহাসনে নয়।একই পৃথিবীতে।
সুফিবাদ, ভক্তিবাদ এবং শেষ কেন্দ্র
সুফিবাদ বলল—অহং ভাঙো।
ভক্তিবাদ বলল—নিজেকে সমর্পণ করো।
আমি বলি—আরও এক ধাপ যাও।
অহং ভেঙে কী হবে, যদি মানুষের মুক্তিই শেষ উদ্দেশ্য
থাকে! নিজেকে সমর্পণ করে কী হবে, যদি পরমের কাছে যাওয়ার
যাত্রার কেন্দ্রও মানুষই থাকে?
মানুষের আত্মা।মানুষের মুক্তি।মানুষের প্রেম।মানুষের ঈশ্বরানুভূতি।
মানুষের পরমপ্রাপ্তি।সবকিছুর কেন্দ্র মানুষ। আমি এই anthropocentric
residue-টুকুও রাখতে চাই না।
আমি বলছি—পৃথিবী মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য তৈরি
কোনো মঞ্চ নয়।প্রকৃতি মানুষের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে না। প্রাণী
মানুষের করুণা পাওয়ার জন্য জন্মায়নি। নদী মানুষের পবিত্রতার প্রতীক হতে বাধ্য
নয়।বন মানুষের আধ্যাত্মিক রূপক নয়।পৃথিবী মানুষের জন্য নয়। মানুষ পৃথিবীর
মধ্যে। এটাই পার্থক্য।
বিজ্ঞান: মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের আবিষ্কার, তারপর বিজ্ঞান। বিজ্ঞান মানুষের অহংকারের সবচেয়ে সুন্দর হত্যাকারী।
Copernicus
বলল—তুমি কেন্দ্র নও।
Darwin
বলল—তুমি আলাদা কোনো সৃষ্টির দ্বীপ নও।
Freud
বলল—তুমি নিজের মনকেও পুরোপুরি জানো না।
Neuroscience
বলল—তোমার “আমি”ও একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে।
Evolution
বলল—তুমি একটি ধারাবাহিকতার অংশ।
Ecology
বলল—তুমি একা নও।
Cybernetics
বলল—তুমি একটি system-এর
মধ্যে একটি node।
Artificial
Intelligence এসে বলল—ntelligence-এর monopoly-ও তোমার নয়।
প্রতিবার মানুষ একটু করে সরে গেল।কিন্তু তার অহংকার বেঁচে রইল।কারণ
মানুষ আশ্চর্য প্রাণী।সে কেন্দ্র থেকে সরে গিয়েও কেন্দ্রের ধারণাটি নিজের সঙ্গে
বহন করেমা আমি সেই ধারণাটাই শেষ করতে চাই।
Post-humanism:
মানুষের পরের মানুষ নয়।মানুষের কেন্দ্রের পরের পৃথিবী।এখানে প্রশ্ন— মানুষ কী? তার বদলে প্রশ্ন—মানুষের
বাইরে কী আছে?এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের
বাইরে থাকা জিনিসগুলোকে মানুষ কেন নিজের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করবে?আমরা প্রাণীকে “animal” বলি।গাছকে “resource”
বলি।নদীকে “water body” বলি।মাটিকে “land”
বলি। বনকে “forest asset” বলি।তারপর তাদের
অর্থ নির্ধারণ করি মানুষের প্রয়োজন দিয়ে।এটাই anthropocentrism।
প্রকৃতিকে আমরা দেখি—আমাদের জন্য কী?Post-humanism প্রশ্ন করে—আমরা প্রকৃতির কাছে কী?প্রশ্নটা ঘুরে গেলেই পৃথিবী বদলে যায়।
এবার Micropolitics:
কারণ মানুষকে শুধু মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে সরালেই হবে না। মানুষ নিজের
শরীরের ভিতরেও একটি ছোট্ট রাষ্ট্র বানিয়ে রেখেছে। আমার শরীর। আমার পরিচয়। আমার
লিঙ্গ। আমার যৌনতা। আমার সৌন্দর্য। আমার আকাঙ্ক্ষা। আমার স্বাভাবিকতা।আমার
নৈতিকতা। সবকিছুর চারপাশে অদৃশ্য boundary। কে এই boundary
বানিয়েছে? পরিবার? ধর্ম?
রাষ্ট্র? বাজার? ভাষা?
সংস্কৃতি? নাকি সবকিছু মিলে? আমি যে “আমি”—সেটি কি সত্যিই
আমার? নাকি আমার ভিতরে বহু পুরনো ক্ষমতার কণ্ঠ কথা বলে?
আমি নিজেই নিজের censor। নিজেই নিজের police।নিজেই নিজের prison guard। এই জায়গায় রাজনীতি আর
সংসদে থাকে না। রাজনীতি ঢুকে পড়ে শরীরে। বিছানায়। প্রেমে।কথায়। চোখের দৃষ্টিতে।
আকাঙ্ক্ষায়। এমনকি নিজের সম্পর্কে নিজের ধারণাতেও। এটাই Micropolitics।
কেন্দ্রহীনতার দিকে তাই আমার কাছে Post-humanism এবং Micropolitics
একই বিদ্রোহের দুই দিক।
একটি বলে— মানুষকে কেন্দ্র থেকে সরাও। অন্যটি বলে—
“মানুষ” নামের subject-টিকেই
dissect করো। একটি মহাবিশ্বের কেন্দ্র ভাঙে। অন্যটি ব্যক্তির
ভিতরের কেন্দ্র ভাঙে। একটি anthropocentrism-কে আক্রমণ করে।
অন্যটি identity-র স্থায়িত্বকে আক্রমণ করে। দুটো মিলে
মানুষকে একটি স্থির noun থেকে একটি চলমান verb-এ পরিণত করে। মানুষ আর “কী”—এই
প্রশ্ন নয়। মানুষ হয়ে উঠছে কীভাবে—এই প্রশ্ন।
আমি কোনো নতুন ঈশ্বর বানাতে চাই না। কোনো নতুন কেন্দ্রও নয়। মানুষকে
সরিয়ে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ প্রকৃতিকে কেন্দ্র করলেও
আবার একটি কেন্দ্র তৈরি হবে। আমি কেন্দ্রহীনতার দিকে যেতে চাই। Multiplicity। Relation Becoming। Flow।
কোনো hierarchy নয়। কোনো final subject নয়। কোনো চূড়ান্ত “আমি” নয়।
কোনো একক মহাকেন্দ্র নয়। শুধু অসংখ্য অস্তিত্বের পারস্পরিক সংঘর্ষ, সহাবস্থান, উৎপাদন, বিলয় এবং
পুনর্গঠন।
মানুষের সবচেয়ে বড় মুক্তি হয়তো মানুষ হওয়া থেকে মুক্তি নয়।বরং— মানুষের নিজের সম্পর্কে তৈরি ধারণা থেকে মুক্তি। “আমি
শ্রেষ্ঠ।” "। আমি কেন্দ্র।” “আমি
স্বাধীন।" “আমি স্থির।” “আমি
সম্পূর্ণ।” “আমি আমার নিজের।”
প্রতিটির শেষে একটি প্রশ্নচিহ্ন বসাও। তারপর দেখো—“আমি” কতটা টেকে। হয়তো টিকবে না। য়তো ভেঙে যাবে। হয়তো
ভাঙার মধ্যেই নতুন কিছু তৈরি হবে। আর সেই নতুন কিছু হয়তো আর মানুষ নামটিকেও আগের
মতো বহন করবে না। তাই আমি বলি—মানুষকে অতিক্রম করো। ঈশ্বর
হওয়ার জন্য নয়। অমানব হওয়ার জন্যও নয়। বরং সেই পুরনো ধারণাটিকে ধ্বংস করার
জন্য- যেখানে মানুষ নিজেকে সবকিছুর মাপকাঠি বলে ধরে নিয়েছে।
“সবার উপরে মানুষ সত্য।”
আমি বলি— সবার উপরে কেন কেউ থাকবে?
“অহং ব্রহ্মাস্মি।”
আমি বলি—অহং কেন?
“আনাল হক।”
আমি বলি—আনাল কেন?
“আশরাফুল মাখলুকাত।”
আমি বলি—শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি কে বানাল?
সুফিবাদ। ভক্তিবাদ। মানবতাবাদ। রাষ্ট্র। বিজ্ঞান। প্রযুক্তি।সবকিছুকে
একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাও—
মানুষ কোথায়? তারপর আরেকটি প্রশ্ন— মানুষকে কেন্দ্রেই বা রাখতে হবে কেন? সম্ভবত উত্তরটি
কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই। কোনো দর্শনগ্রন্থেও নেই। কোনো algorithm-এও নেই। উত্তরটি হয়তো এখনও তৈরি হয়নি। আর সেই অজানা উত্তর তৈরির জন্যই
মানুষের পরবর্তী যাত্রা। মানুষের বিরুদ্ধে নয়। মানুষের জন্যও নয়।মানুষের পরেও।
