i মুর্শিদাবাদের টাকায় চলেছিল দিল্লির মসনদ/ইসরাইল সেখ

মুর্শিদাবাদের টাকায় চলেছিল দিল্লির মসনদ/ইসরাইল সেখ

 


মুর্শিদাবাদের টাকায় চলেছিল দিল্লির মসনদ

        ইসরাইল সেখ

 

অষ্টাদশ শতক যখন ভারতের রাজনৈতিক অনৈক্য ও অনিশ্চয়তার এবং সংকটজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তখন যে সমস্ত ব্যক্তি, জীবনের নানান ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ শিকড়ে আরোহন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁন।একদা ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। আর এই মুর্শিদাবাদ কে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলার প্রথম নবাব,'আলাউদ্দিন জাফর খান বাহাদুর' উপাধি ধারণকারী মুর্শিদকুলি। তিনি ঢাকা থেকে রাজধানী কে, সুবে  বাংলার রাজধানী হিসেবে ভাগীরথী নদীর তীরে মুকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন এবং নিজের নামে নাম রাখেন মুর্শিদাবাদ ।

আনুমানিক ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলির  জন্ম হয় দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। তার আসল নাম ছিল সূর্য নারায়ন মিশ্র। তার জীবন কাহিনী খুব বিচিত্রময়; ব্রাহ্মণ পরিবারের জন্ম হলেও তার ভাগ্যে ঘটেছিল নির্মূল পরিহার। ঘটনাক্রমে পরিবার থেকে চ্যুত হয়ে দাস হিসেবে জীবন অতিক্রম করতে হয়েছিল তাকে। সম্ভ্রান্ত মোগল কর্মী হাজী সাফি ইস্পাহানি মুর্শিদকুলি কে দিল্লির দাস বাজার থেকে ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কিনেছিলেন, এবং পরবর্তীকালে তাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন এবং নাম রাখেন মোহাম্মদ হাদি। ইস্পাহানি তাকে পালিত পুত্র হিসেবে লালন পালন করে এবং সুশিক্ষার আদলে গড়ে তোলেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁর পরিচয় হয় পালিত পিতা ইস্পাহানির যোগসূত্রে। হাজী সাফি ইস্পাহানি মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অধীনে 'দেওয়ান- ই-তান' (DIWAN- I - TIN) পদে কর্মী ছিলেন। তবে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সুনজরে পড়েছিলেন , তাঁর মৃত্যুর পর মুর্শিদকুলি যখন বেড়ার প্রদেশের দেওয়ান আব্দুল্লাহ খোরাসিনীর অধীনে কাজ করছিলেন, ঠিক সেই সময় এই সুশিক্ষিত যুবক ঔরঙ্গজেবের নজরে আসেন।পরবর্তী সময়ে মুর্শিদকুলি খাঁর কাজে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাকে ১৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে হায়দ্রাবাদের দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন। এইভাবে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ও মুর্শিদকুলি খাঁর পরিচয় হয়।

১৭০২ খ্রিস্টাব্দ (মতান্তরে ১৭০১) থেকে ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অত্যন্ত দৃঢ় কর্মদক্ষতার পরিচয় দেন মুর্শিদকুলি। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব যখন মারাঠা যুদ্ধে অর্থহীন হয়ে পড়েন এবং রাজকোষ প্রায় শূন্য অবস্থায় তখন তিনি মুর্শিদাবাদের এই দক্ষ সৎ চরিত্রবান ব্যাক্তি মুর্শিদকুলিকে  চিঠি লিখেছিলেন এবং উল্লেখ করেছিলেন সম্রাটের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা। তখন মুর্শিদকুলি খাঁ সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং মুর্শিদাবাদ থেকে ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে ১ কোটি টাকা (মতান্তরে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা) রাজস্ব তু্লে সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে পাঠিয়েছিলেন। আর সেই টাকা দিয়েই ঔরঙ্গজেব দিল্লির সাম্রাজ্য চালিয়েছিলেন এবং  সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে ব্যয় করেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সম্রাট ঔরঙ্গজেব মোহাম্মদ হাদিকে 'মুর্শিদকুলি খাঁন' উপাধিতে ভূষিত করেন। সাধারণত বলা যায় সম্রাট ঔরঙ্গজেব শেষ জীবনে সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য মুর্শিদকুলি খাঁর দেওয়া টাকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

Post a Comment

Previous Post Next Post