i তিক্ত মধুর ভাবনা: এক অদৃশ্য কোডিংয়ের খেলা—আজিজুল হাকিম

তিক্ত মধুর ভাবনা: এক অদৃশ্য কোডিংয়ের খেলা—আজিজুল হাকিম

 
তিক্ত-মধুর ভাবনা: এক অদৃশ্য কোডিংয়ের খেলা

— আজিজুল হাকিম 

মনে করুন, একটি মানুষ সান্ধিক প্রসন্নতা মাখা অনুর্বর ফাঁকা মাঠের মাঝে একটি টিলার উপরে চুপচাপ বসে আছে। তার চোখ দুটো দূর, বহু দূরে পাড়ি জমিয়েছে কখন কে জানে। সে খুঁজে যাচ্ছে তার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস সারাক্ষণ। 
কিন্তু এখানে! মানব শূন্য এই ফাঁকা প্রান্তরে! 
এদিকে নিভু নিভু সূর্যটা তার সৌন্দর্যের অহংকারে পুরো আকাশকে রঙিন করে তুলছে। তখন সে আকাশের লালিমায় চোখ স্থির রেখে নিমগ্ন। তারপর সমস্ত লালিমার রেশ মুছে আঁধারের নীরব তরঙ্গ আস্তে আস্তে সমস্ত চরাচরে গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। 
ঠিক তখনই সেই হারিয়ে যাওয়া লালিমার পরশ মেখে ডালিম ফলের মত রঙিন হয়ে চাঁদটি পূব আকাশে উঠতে শুরু করল। তারপর সেই লালিমার প্রভা সরিয়ে কমলার রঙে জ্বলে উঠল সেই চাঁদ। এভাবেই সেটি যত উপরে উঠে যাচ্ছে ততই তার সৌন্দর্য আর রূপের নীরব উচ্ছ্বাস বেড়েই চলেছে।
হ্যাঁ, এটিই এই পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস। সূর্যের আগমন, তার প্রত্যাবর্তন; চাঁদের উদয় আর অস্ত গমন — এই হচ্ছে জীবন মৃত্যুর পথ চলা। কিন্তু এটাও পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম পাতা নয়। 
এর বাইরেও যদি চলে যেতে হয় তাহলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে রুপোলি আগুন বুকে একপিণ্ড নরম ফাগুনের দেশে — মৃত থেকে জীবিত হওয়ার স্পন্দিত কুসুম সঙ্গীতে। 
তারপর গর্ভের ভয়ঙ্কর চিৎকার। ঘটে গেল নিক্ষিপ্ত বীজের স্থলন। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল অগুণিত সূর্য, পৃথিবী আর চাঁদ। 
কি আশ্চর্য! তাই না? 
লাগামহীন সময় বয়ে চলেছে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গীতে। 
কিন্তু যে মানুষটি আদিগন্ত মাঠের মধ্যে বসে আছে এখানে তার ইতিহাস কই? কোথায় তার নক্ষত্রিক জীবনের উল্লাস?
 চারিদিকে তো গভীর উত্তপ্ত পাথরের ঝড়ো সঙ্গীত আর আগুনের সর্পিল খেলা। সেই আগুনেও কি জীবনের স্পন্দন লুকিয়ে ছিল? সেখানেও কি লুকিয়ে ছিল মানবদেহের হাসি কান্নার আস্ফালন? সেখানেও কি লুকিয়ে ছিল চেতনাহীন চেতনা? সেখানেও কি সুপ্ত ছিল মানুষের প্রেম-বিরহের সাদা-কালো হাসি-কান্না আর সুখ-দুঃখের নরম-কঠিন সুমধুর যন্ত্রণা? 
হয়তো ছিল। সেই আগুনের আশ্ফালনেই লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য মানুষের দৃশ্যে ফিরে আসার প্রথম সংগীত। 
সেটি কি আসল ইতিহাস, না অ্যাডাম ইভের স্বর্গ হারানোর একটা কল্পমালার গল্প কাহিনী মাত্র? 
আজ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমি কোন জানালা দিয়ে উঁকি মারবো? কোন জানালা দিয়ে উঁকি মারবে সত্যের শুভ্র ফুলের পাপড়িগুলো। 
আসলে এখানে কি সত্য বলে কিছু আছে? অথবা মিথ্যে? এসব তো আমরাই নির্ধারণ করেছি। আমরা দুচোখে যা দেখি তাই কি সত্য বলে ভেবেছি। ছোট্ট বেলায় আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আমাদেরকে শিখিয়েছে সত্য-মিথ্যের পার্থক্য। কিন্তু তার মধ্যেও কত কত গণ্ডগোল, কত বিভ্রম লুকিয়ে আছে — তো আমরা কতটুকু দেখি। সেখানেও তো হাজার ভ্রমের ইল্যুশন খেলা করে এই ছলনার জগতে। না, সত্য বলে কিছু নেই। সবই কি মিথ্যে স্পন্দনে জাগরিত জীবন? কোথা থেকে এসেছে এই জীবন? কোথায় চলে যাবে, তার কি কোন ঠিকানা আছে? আসলে "আমি" এটাও কি সত্য? না এটাও মিথ্যে? আমার দেহে কি জীবন বলে কিছু আছে? না লক্ষ-কোটি যন্ত্রাংশের সম্মিলিত গানের এক বহিঃপ্রকাশ? 
কে দেবে এই সব প্রশ্নের উত্তর? কোন গ্রন্থে পাওয়া যাবে প্রাঞ্জল সমাধান? না, কোন গ্রন্থেই পাওয়া যাবে না! না সমস্ত গ্রন্থই যারা ঐশ্বরিক বলে দাবি করে সবটাই মিথ্যা! যুগে যুগে যুগের প্রয়োজনে সে সব এসেছিল। তৎকালীন সময়ে মানুষের দাবি মেটানোর জন্য। কোন মতবাদ কি চিরসত্য? যদি চির সত্যই হয়; তাহলে বিশেষ বিশেষ সময়েই বিশেষ বিশেষ ঘটনাক্রমে কেন শ্লোকগুলি কলকলিয়ে হেসে ওঠে, ক্রুদ্ধ হয়, মানব সমাজে ভাঙনের গান গায়? হাজার বছর আগের চাহিদা আর আজকের চাহিদা কি এক? হয়তো কিছুটা এক, আবার কিছুটা এক নয়। যখন এই বিশ্ব প্রকৃতিতে কোন কিছুই শাস্বত নয়, তখন কেন কিছু গ্রন্থবাণী শাশ্বতর দাবি রাখে? সবই তো "কালের প্রবাহে এসেছে, চলে যাবে কালের প্রবাহে একদিন"। 
কোন অদৃশ্য কোডিং-এ অনবরত রচিত হচ্ছে আমাদের জীবনের স্পন্দন? রহস্যময় এই বিশ্বজগতে কেউ কি জীবনের কোন মানে খুঁজে ফেরে? আদৌ কি জীবনের কোন মানে আছে, না অদৃশ্য কারো লীলাক্ষেতে রচিত হিংস্র ভালবাসায় আমাদের এখানে ভ্রমণ?
 আসলেই কি আমরা অন্য কোথা থেকে এসেছি, না এটাই আমাদের চিরকালীন পরিবর্তনশীল ক্রীড়াভূমি? 
 এই জগতের সমস্ত প্রাণী কি একক জীবন স্পন্দনের খেলা নয়? লক্ষ কোটি বছরের পরিবর্তনশীল বৈচিত্র্য নয়?  না হও বললেই হয়ে গেছে সবকিছু? যারা ধার করে গেছে প্রাচীনকালের গল্প-কবিতার শ্লোক সেই শ্লোককে তারা আর শাশ্বত বলে কি বলে? এটাও কি ভন্ডামি নয়? 
না কোন অদৃশ্য শক্তির খেলার ছলে কবিতার চঞ্চু ছুঁয়ে নেমে এসেছি সেই ইডেন থেকে? সেও কি বারবার ভুল করে আর তার ভুল সংশোধন করে? কে দেবে উত্তর? আর উত্তর ও যদি পাওয়া যায় তাহলেও আমার মন যেটাকে ঠিক বলবে মেনে নেবে সেটিকেই আমি ঠিক বলে মেনে নেব আর আমার মন যেটাকে মেনে নেবে না, সেটি ঠিক হলেও আমি ঠিক বলে মেনে নেব না। এটাই মানব সমাজের চরিত্র। 
আগুনেই কি লুকিয়ে ছিল জীবনের স্পন্দন? না প্রথমে শূন্যতা, তারপর সেই শূন্যতার মাঝেই আগুনের জয়গান? যে গড়েছে এই বিশ্বজগত সেও কি নিষ্ঠুর কামারের মতো পেটিয়ে যায় গরম শলাকা? আসলে শূন্যতা কি এই বিশ্বজগতের নিয়ামক শক্তি? না এই সমস্ত কিছুর সংমিশ্রিত শক্তি একটি সত্তা? আসলে হয়তো কিছু নেই, হয়তো বা আছে। 
আর যদি থাকে, সেই কি পাঠিয়েছে ধর্ম আগুন ভালোবাসার খেলা? সেই কি পাঠিয়েছে তার ঐশী বাণী যুগে যুগে? কিন্তু ভালোবাসার জন্য, ক্ষুধা মিটানোর, জন্য এমনকি সমস্ত জীবজগতের জৈবিক ক্রিয়া সম্পাদন করার জন্য কোন বাণী না পাঠিয়ে সমস্ত জীবজগতের শিরায় শিরায় স্পন্দন জাগিয়েছে। সময় তাগিদেই সবকিছু আসে আবার চলে যায়।
 
একদিন মানুষ ভুলে যাবে সমস্ত বিচ্ছেদ আর ভাগাভাগির বাণী। 
(চলবে....)

Post a Comment

Previous Post Next Post