আমার ছেলেবেলা আর বৃষ্টিমুখর দিনগুলি
— আজিজুল হাকিমছেলেবেলাব মানেই হাজারো স্মৃতির সমাহার।ছেলেবেলা মানেই রঙ্গিন স্বপ্নে বিভর। সেই ছেলেবেলার অনেক স্মৃতির নুড়ি পাথরের মধ্যে থেকে আমি আজ সেদিনের বর্ষার দিনগুলির হাসি কান্নাগুলো বর্ণনা করতে চলেছি।
সেদিনের বর্ষা মানেই সারাদিন ধরে রিমঝিম বৃষ্টির ধারা আর মাঠ-ঘাট, খাল-বিল সবকিছুই জলে টুইটম্বর। সে দিনের বর্ষা মানেই বৃষ্টি আর বন্যার জলে মাঠে সমুদ্রের মতো জলের বিস্তৃতি আর সেই জলধি বুকে পূবালী বাতাসের ধাক্কায় ছোট ছোট ঢেউয়ের খেলে বেড়ানো। তখনকার বর্ষা মানে সারা আকাশ জুড়ে কালো ঘুটঘুটে মেঘের বৃষ্টির আস্ফালন। সেদিনের ভরসা মানেই পথঘাট আর বাড়ির উঠোন সবকিছুই কাদায় প্যাচপ্যাচে অবস্থা। তখনকার বর্ষা মানেই চারিপাশে গাছ আর ঝুপেদের সবুজ হাসির বিচ্ছুরণ। সেকালের বর্ষা মানে ডানকুনি, জাল আর বিত্তি নিয়ে লোকের মাছ মারার জন্য মাঠে, খালে, বিলে ছুটে বেড়ানো। তখনকার বর্ষা মানেই কারো উনোন ভিজে রান্না বন্ধ; কারো আবার চালাঘর হুড়মড়িয়ে পড়া।
হ্যাঁ, আমি সেই সব দিনগুলি কথাই বলছি; যখন আমার ছেলেবেলা আর ভরা বর্ষার তোড়জোড়।
আমি গ্রামের ছেলে তাই আজ এখানে গ্রামের বর্ষাকালের কথাই বলছি। সে সময় সমস্ত রাস্তা ও পথগুলি মাটির তৈরি ছিল। গ্রামের অধিকাংশ ঘরগুলি, সেগুলিও ছিল মাটির তৈরি। তখন পথঘাটের বুকের উপরে পিচ আর পাথর দিয়ে ঢাকা পড়েনি। কাঁচা বাড়ি। উসরা থেকে নামলেই কাঁদাতে পা ভরে ভরে যাবেই। তারপর রাস্তায় হাঁটলে জুতো বা চপ্পলের ব্যবহার করা যেত না। রাস্তায় চলতে গেলে হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে যেত। কোন কোন জায়গায় কমরও ডুবে যেত। সেই কাদার মধ্যে দিয়ে আমরা গ্রামের ছেলে মেয়ে ও মানুষজনেরা হেঁটে বেড়াতাম। সেই কাদার বুকে হাঁটতে হাঁটতে চাষীরা লাঙ্গল কাঁধে মাঠের দিকে রওনা দিত। ধান রোপনের আনন্দে তারা মাঠে মাঠে চিৎকার করে পল্লীগীতি আর ভাটিয়ালি সুর তুলত। সে সময় বিহার থেকে সাঁওতালি লোকজন আমাদের পাড়ায়, আশেপাশে গ্রামে কাজ করতে আসতো। তারাও সেই কাদার মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে দলবদ্ধভাবে মাঠে যেত। তারপর যখন মাঠে ধান লাগার কাজ করতো তখন তারা সুন্দর সুর তুলে একই সঙ্গে গান গেয়ে যেত। অনেকদিন জমির আলে বসে বসে তাদের সুমধুর হৃদয়গ্রাহী গান শুনেছি। তাদের আচার ব্যবহারও খুব নম্র ছিল। কিন্তু তাদের কাছে ছোট বড় বলে কেউ ছিল না। সকলকেই তারা 'তুই' বলে কথা বলতো। ওরা বিহার থেকে এসে গ্রামের যারা সচ্ছল ছিল তাদের বৈঠকে তারা থাকতো। ওরা সারাদিনের কাজের শেষে যখন বাড়ি ফিরতো তখন যার জমিতে কাজ করতো তার বাড়ি গিয়ে সেই বাড়ি থেকে চাল-ডাল, নুন-তেল নিয়ে তাদের বাসায় চলে যেত।তারপর তারা সেসব রান্না করত রাতের খাবারের জন্যে।
একদিন দেখলাম ওরা আমাদের জমিতে ধান লাগতে গিয়েছে। তারপর ধান লাগা শেষ হলে ওরা ফিরে এসে আমার মায়ের কাছ থেকে ওরা এসব নিয়ে গেল। এমনকি মাকে ফুঁসলিয়ে কিছু এক্সট্রা চাল-ডাল, জ্বালানি নিয়ে গেল।
সেই বর্ষার দিনে আমিও ছাগল নিয়ে মাঝেমধ্যে মাঠে চলে যেতাম। ছাগলগুলো কখনোই কাঁদায় নামতে চাইতো না। তবুও তাদেরকে এক রকম জোর করেই নিয়ে যেতাম। তারপর সেই কাদার রাস্তা ধরে ছপছপ করতে করতে মাঠে চলে যেতাম।রাস্তার ধারে তাদেরকে চরাতাম। কারণ তখন মাঠ ঘাট সবকিছুই জলে পরিপূর্ণ ছিল। কারো পাট কাটলে সেই জলের মধ্যে দিয়ে ছাগলকে নিয়ে যেতাম। আমার এখনো মনে পড়ে হাঁটুর উপর জলে আমি ছাগলকে মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে পাটের পাতা খাইয়ে নিয়ে এসেছিলাম। সেদিন আমাদের পাট কাটছিল।
ঘন বর্ষা হলেই কখনো কখনো পাড়ার ছেলেরা দলবদ্ধভাবে বৃষ্টি ভেজার আনন্দে পথে নেমে পড়তো। আমিও কোনো কোনো দিন নেমেছি। যদিও আমার বাবা-মা আমাকে সেই বৃষ্টিতে ভিজতে এবং কাদা মাখতে দিতে চাইতেন না। তবুও কখনো কখনো আমি চুরি করি সেই ছেলেদের দলে পালিয়ে গেছি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি ওদের সঙ্গে গ্রাম পেরিয়ে মাঠের মধ্যে চলে গেছিলাম। সেদিন আমরা সারা গায়ে কাদা মাখামাখি করেছিলাম এবং যাকে গ্রামের ভাষায় ধুলোট খেলা বলে, সেটাও করেছিলাম। কাদায় গড়াগড়ি খাওয়া, কাদার মধ্যে পিছলে যাওয়া এবং এর গায়ের উপরে ওর পড়ে যাওয়া - এসবই আমরা সেই দিন করেছিলাম। এদিকে আকাশের বুকে মাঝে মাঝে বাজ চমকালেও আমরা তাকে ভয় পাইনি। আমরা কাদায় গড়াগড়ি খেতে খেতে, হইহুল্লোড় করতে করতে এবং পিছল খেলা খেলতে খেলতে দূরের গাঁঠিয়ার মাঠে চলে যেতাম। তারপর সেখানে একটি সাগরের মতো বন্যার জলোচ্ছ্বাস দেখতাম। আমাদের গ্রামে বন্যার জল আসতো না। কিন্তু কোন কোন বছর আমাদের মাঠে ভৈরব নদী উপছে বন্যার জল আসতো। তখন বন্যার জলে সারা মাঠ থৈ থৈ করত। যে সাঁকো দিয়ে বন্যার জল এপার থেকে ওপারে যেত, সেই সাঁকোর উপর থেকে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে সাঁকোর তলা দিয়ে বন্যার জলের সঙ্গে আমরা সাঁতার কাটতে কাটতে ভেসে যেতাম। আবার ফিরে এসেছি। তারপর আবার সেই জলে ঝাঁপ দিয়েছি। এভাবেই চলে গেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। তারপর যখন বাড়িতে ফিরে এসেছি তখন বাবা-মা জানতে পারলে ভীষণ উত্তম মাধ্যম দিতেন। অনেকদিন মার খেয়েছি। তবু ও সুযোগ পেলেই আবার পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে সেই বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছি।
কোন কোন বছর যখন বৃষ্টি না হয়েছে তখন পাড়ার যুবক ছেলেরা দলবদ্ধভাবে পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে ঢুকে রান্নার চুলো ভেঙ্গে দিয়েছে। তারপর তারা কুয়ো থেকে জল তুলে, রাস্তায় ধুলোর মধ্যে জল ঢেলে, কাদা করে সেখানে গড়াগড়ি খেতো। তারপর এমনও দেখা গেছে ওরা যখন গড়াগড়ি খাচ্ছে; তখন হঠাৎ করে আকাশে মেঘ জমা হয়েছে আর মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। তখন সারা গ্রাম আনন্দে উৎফুল্লিত হয়েছে। যদিও অনেক বাড়িতেই পাড়ার ছেলেদেরকে চুলো ভাঙতে দেয়া হতো না; তবুও ওরা জোর করে চুলো ভাঙতো এবং বাড়ির মেয়েরা তখন তাদেরকে গালাগাল করত। তাতেও তারা কোনরকম কিছু মনে করতো না। এটা একটা সেই সময় আমাদের গ্রাম্য রীতি ছিল। যদি খরা হয় এবং অনাবৃষ্টি হয় তাহলে পাড়ার ছেলেরা দলবদ্ধভাবে এ কাজ করত। এতে পাড়ার বা গ্রামের মাতব্বরদেরও সহযোগিতা থাকতো। কোন বাড়ির কোন অভিভাবক ওদেরকে বারণ করত না। কেবল বাড়ির মেয়ে মানুষেরাই প্রতিবাদ করত। কারণ তাদের কাজ বেড়ে যেত।
তারপর যখন একটু বড় হলাম তখন আমার খেলাধুলা অনেকটা কমে যেতে লাগল। কিন্তু যখন বৃষ্টি হতো তখন ঘরে জানালার সামনে শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির ধারাপাত দেখতাম, জানালার সামনে যেসব গাছগুলো থাকত তাদের পাতায় বৃষ্টির ফোটা পড়লে তারা আনন্দে নেচে উঠত। বিশেষ করে সজিনা গাছের পাতার কম্পন আমাকে ভীষণ ভীষণ ভালো লাগতো।
সে দিনগুলির দিকে তাকালে আজও খুব আনন্দ পাই। কিন্তু সেই সোনালী দিনগুলো হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় শোকও প্রকাশ করি। আবার যদি ছোট হতে পারতাম, আবার যদি সেই বর্ষার কাদামাখা রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে পারতাম; তাহলে কতই না ভালো লাগতো!
সে দিনগুলির দিকে তাকালে আজও খুব আনন্দ পাই। কিন্তু সেই সোনালী দিনগুলো হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায় শোকও প্রকাশ করি। আবার যদি ছোট হতে পারতাম, আবার যদি সেই বর্ষার কাদামাখা রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে পারতাম; তাহলে কতই না ভালো লাগতো!
